কবে হবে মুজিবনগরের ৫৩ কিলোমিটার রেলপথ?

318

ডেস্ক রিপোর্ট: মেহেরপুরের সাথে রেল যোগাযোগের প্রস্তাবিত দর্শনা-মেহেরপুর-পোড়াদহ রেলপথ প্রকল্প দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে ফাইলবন্দী রয়েছে। গত ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় কাজ শুরু হয়। কাজের মন্থর গতি দেখে অনেকে মন্তব্য করছেন, আবারও কি ফাইল বন্দী হয়ে যাবে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা দেওয়ার প্রায় ৮ বছর হয়ে গেলেও এখনও মেহেরপুর সদর থেকে শুরু করে মুজিবনগর হয়ে দর্শনা পর্যন্ত ৫৩ কিলোমিটার নতুন রেলপথ নির্মাণ আলোর মুখ দেখেনি। রেলপথ কার্যক্রম বাস্তবায়নে গতি মন্থর। রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ হলেও সরেজমিন সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ না হওয়ায় গতি পাচ্ছে না প্রকল্পটি। ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল ঐতিহাসিক মুজিবনগর দিবস উপলক্ষে মুজিবনগরের জনসভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মেহেরপুর সদর থেকে মুজিবনগর হয়ে চুয়াডাঙ্গার দর্শনা পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরে রেল মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রেলপথ বিভাগের একটি টেকনিক্যাল টিম সরেজমিন মেহেরপুরে এসে প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত উল্লিখিত নতুন ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণের প্রাথমিক সমীক্ষার কাজ শেষ করে গেছে প্রায় তিন বছর আগে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রস্তুত করা প্রাথমিক সমীক্ষা রিপোর্টে প্রস্তাবিত এই ৫৩ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথটিতে মোট ছয়টি রেল স্টেশন ও তিনটি ব্রিজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবিত রেল স্টেশনগুলো হলো, মেহেরপুর জেলার সদর, মোনাখালি, মুজিবনগর এবং চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলা সদর, হাতিভাঙ্গা ও চন্দ্রবাস। সমীক্ষা রির্পোটের ওই প্রস্তাবনায় মেহেরপুর জেলার মুজিবনগর উপজেলার বল্লভপুর পয়েন্ট, চুয়াডাঙ্গার মাথাভাঙ্গা নদীর ওপর দামুড়হুদা উপজেলার চিৎলা পয়েন্ট ও ভৈরব নদের ওপর দামুড়হুদা উপজেলার কানাইডাঙ্গাতে ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ব্রিজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী মেহেরপুর সদর থেকে মুজিবনগর উপজেলা স্টেশন হয়ে গাইদঘাট ও জয়রামপুর স্টেশন থেকে দুটি নতুন লাইন মিলিত হবে যা দামুড়হুদা হয়ে দর্শনা স্টেশনে পৌছাবে। সমীক্ষা রিপোর্টের ওই প্রস্তাবনায় ছয়টি স্টেশনসহ ৫৩ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণের জন্য মেহেরপুর সদর, মুজিননগর উপজেলা এবং চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলায় মোট ৫৪০ একর কৃষি জমি অধিগ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রেলপথ বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের টেকনিক্যাল টিমের সরেজমিন সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ শেষ না হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী-প্রতিশ্রুতির গুরুত্বপূর্ণ এই রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটি গতি পাচ্ছে না। মেহেরপুরের জনগন প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি করে বলেন, ঐতিহাসিক মুজিবনগর কেন্দ্রীক মেহেরপুর একটি সুবিধা বঞ্চিত জেলা। জেলার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য রেলপথের বাস্তবায়ন করা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থলবন্দরের দাবি করেন। রেল সংযোগ চালু হলে মেহেরপুরের মুজিবনগরে পর্যটকদের সংখ্যা বেড়ে যাবে। যা মেহেরপুরের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মেহেরপুর কৃষি নির্ভর এলাকা। মেহেরপুরের সবজি সারা দেশের চাহিদার অনকেটাই পূরণ করে। কিন্তু শুধুমাত্র যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অনেক সময় এলাকার কৃষকরা তাদের উদপাদিত সবজির ন্যায মূল্য পাইনা। তাই মেহেরপুরবাসী দ্রুত রেলপথের বাস্তবায়ন দাবি করেন। মেহেরপুরে রেলপথের বাস্তবায়ন হলে নিশ্চিন্তে খুব সহজে ও কম খরচে আমরা যাতায়াত করতে পারবে। এখন মেহেরপুরে ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যায়নরত রয়েছে। রেলপথ হলে সকল শিক্ষার্থীরায় উপকার হবে। তাই দ্রুত রেলপথের বাস্তবায়ন চান।
এই বিষয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলপথ মন্ত্রাণালয়ের তৎকালিন অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) শশী কুমার সিংহ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির বিষয়ে আমরা সজাগ আছি। এটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। বর্তমানে প্লানিং চলছে। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য রেল বিভাগের উচ্চ পর্যায়ের একটি টেকনিক্যাল টিম খুব শিগগিরই মেহেরপুরে যাবে। সাম্ভব্যতা যাচাইয়ের রিপোর্ট পাওয়া গেলে, সেটি চুড়ান্ত অনুমোদনের পর কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। কিন্ত আজও বাস্তবায়ন হয়নি।
মেহেরপুর জেলা সদর ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য দিক দিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ববহ। কিন্ত এ জেলা শহরের সাথে সড়ক যোগাযোগ ছাড়া রেল যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা নেই। নৌ-পথ ছিল তাও বন্ধ হয়ে গেছে। মেহেরপুরের সাথে রেল যোগাযোগের প্রথম প্রস্তাবনা আসে বৃটিশ আমলে। এ সময় পোড়াদহ-মেহেরপুর-করিমপুর রেলপথ স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। এটি একটু পরিবর্তন করে চুয়াড়াঙ্গা-মেহেরপুর-দৌলতপুর-রায়টা-ভেড়ামারা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। পরবর্তীতে এটি আর কার্যকর হয়নি। দেশ স্বাধীনের পর আবার প্রস্তাবিত রেলপথ নিয়ে কথাবার্তা শুরু হয়। ১৯৭৭ সালে প্রস্তাবিত রেলপথের আবার সংশোধন আনা হয়। সংশোধিত প্রস্তাবে দর্শনা-মেহেরপুর-পোড়াদহ পর্যন্ত রেলপথ স্থাপনের কথা বলা হয়। সে মতে ১৯৭৭ সালের ২৪ জানুয়ারি তৎকালীন মেহেরপুর মহাকুমা প্রশাসন প্রকল্পে সুপারিশ করেন। চেষ্টা তদবিরের পর তৎকালীন রেলওয়ে মন্ত্রীর নির্দেশে ৬ নভেম্বর ১৯৭৯ সালে প্রস্তাবিত রেলপথ স্থাপনে তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়।
১০ এপ্রিল ১৯৮২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন। ১৮ এপ্রিল ১৯৮৩ সালে মেহেরপুর পৌরসভার এক বৈঠকে প্রকল্পের ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনার পর তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। এরপর ১৪ মে ১৯৯৫ সালে মেহেরপুর জেলা প্রশাসক প্রস্তাবিত প্রকল্পটি খুলনা বিভাগীয় কমিশনের মাধ্যমে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো উদ্দ্যোগ নেন। খুলনা বিভাগীয় কমিশনার বিষয়টি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সচিব বরাবর পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। মাঝে একবার এ বিষয়ে কিছু অগ্রগতির কথা শোনা গেলেও এখন আর কোন পদক্ষেপ গ্রহনের কথা শোনা যাচ্ছে না।
এই প্রস্তাবিত রেলপথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় মেহেরপুর জেলায় ব্যবসা বাণিজ্য এবং শিল্প কারখানায় দীর্ঘ দিনে স্থবিরতা নেমে এসেছে। মেহেরপুরের সাথে অন্যান্য জেলায় রেল যোগাযোগ না থাকায় উৎপাদিত পন্য এবং অন্যান্য জিনিসপত্র এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন ব্যয়বহল এবং কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছে। মেহেরপুর থেকে ৪/৫ লাখ বেল তামাক দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া তুলা প্রেরণ করা হয় ১০/১২ হাজার বস্তা। একইভাবে উৎপাদিত গম, ধান, চাল এবং ফলমুল দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয়। এছাড়া খুলনাসহ অন্যান্য জেলা থেকে বছরে কেবল মাত্র ট্রাকযোগে ৪/৫ লাখ মন সার মেহেরপুরে আসে। খাদ্যশষ্য আসে ৫/৬ লাখ মন। বছরে অন্যান্য মালামাল এ জেলা থেকে অন্য জেলায় আনা নেয়া হয় প্রায় ২০ লাখ মন। পণ্য আনা নেয়া কেবল মাত্র সড়কপথে ট্রাকযোগে সম্পন্ন হয়। প্রস্তাবিত রেলপথ স্থাপিত হলে ব্যবসা বাণিজ্য সমৃদ্ধ এলাকা হিসাবে খ্যাত মেহেরপুর, শোলমারী, কুতুবপুর, কেদারগঞ্জ মুজিবনগর, গাংনী, বামুন্দী, জোড়পুকুর, আমলা, খলিশাকুন্ডি, সমিরপুর প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানের সাথে সংযোগ স্থাপিত হবে। এছাড়া প্রস্তাাবিত রেলপথ চালু হলে এলাকায় আরও অনেক শিল্পকারখানা স্থাপিত হবে।
এ বিষয়ে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন বলেন, রেলপথ নির্মাণের জন্য সকল প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সরকার ও রেল মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ে নিয়মিত যোগাযোগ করছি। আশা করি এই সরকারের বাকি সময়ের মধ্যেই রেলপথের বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।