এ যেন অন্য রকম বেঁচে থাকা

158

চলতি সেমিস্টারের মধ্যবর্তী পরীক্ষা শেষে ইট–বালুর শহরের কোলাহল থেকে কিছুক্ষণের জন্য মুক্তি পেতে ছুটলাম সমুদ্রে। করোনাভাইরাস তখন চীনের উহান শহর থেকে খুব বেশি বিস্তার হয়নি। সেন্ট মার্টিনের দুর্বল নেটওয়ার্কে মোবাইল হাতে যখন নিউজ ফিড স্ক্রল করছিলাম, তখন পাশ থেকে হঠাৎ এক সহপাঠীর চিৎকার। জানাতে পারলাম বাংলাদেশেও একজন আক্রান্ত।

এরপর থেকে নতুন কিছু শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলাম কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন, লকডাউন। এসব অজানা এক আতঙ্ক মনের মধ্যে নিয়ে ঢাকায় ফেরা।

সমুদ্রবিলাসের পর যখন কোলাহলভরা এই বিচিত্র শহরে পা রাখলাম, তখন সুনসান নীরবতা। পরীক্ষার ছুটির পর যখন ক্যাম্পাসের উদ্দেশে রওনা হলাম, তখন দেখতে পেলাম এক ভিন্ন শহরের চিত্র। যে শহরের বাসে রোজ ঝুলে ঝুলে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়, সে বাসে সেদিন আমিসহ ৯ জন যাত্রী। মাঝেমধ্যে বিভিন্ন বাস স্টপে বাস রেখে মানুষ ওঠানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছেন হেলপার। কিন্তু বাস স্টপগুলো প্রায় জনশূন্য। অথচ নগরবাসীকে তখনো অন্তরীণ থাকার আদেশ জারি হয়নি, তবু এমনই জনহীন। ক্যাম্পাস থেকে ফেরার পথে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত হলেও ধানমন্ডি লেক, ব্যাচেলার পয়েন্ট এতটা নীরব হতে দেখিনি। সেই স্থানগুলো এখন দিনের বেলায়ও খাঁ খাঁ করতে থাকে। মনে হয় যেন হরতালের দিনের নীরব ঢাকা। খুদে এক ভাইরাস শুধু এই শহর নয়, পুরো মানবজাতিকে ত্রাসের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

দেশে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা যখন বেড়ে চলতে শুরু করল, তখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালত সব ছুটি ঘোষণা করা হলো। সব একদম নিশ্চুপ হয়ে গেল। বন্ধ হয়ে গেল সুপার মার্কেট, শপিং মল। চলতে থাকে অঘোষিত লকডাউন।

থমকে যায় জীবনের চাকা, চারদিকে হাহাকার! পোশাক কারখানা বন্ধ থাকায় লাখো শ্রমিক বেকার। কারখানাগুলো বন্ধ, কৃষক পণ্যের ন্যায্যমূল্যবঞ্চিত, কারণ, চারদিকে নির্জন, নেই ক্রেতা। এর মধ্যে অনেক মা–বাবা সন্তানকে জাপটে ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছেন অন্ন! দুবেলা, দুমুঠো অন্নের খোঁজে রাস্তায় দিগ্বিদিক ছুটছেন ত্রাণ আর সাহায্যের জন্য। থমকে গেছে তাঁদের জীবন, আয়ের পথ বন্ধ!

সারা দিন বাসার সামনে মোড়ের দোকানগুলো খোলা থাকলেও সেখানে চায়ের আড্ডায় কাউকে দেখা যায় না। সন্ধ্যার পর থেকে জনশূন্য ওষুধের দোকানটায় মিটমিট করে আলো জ্বলতে থাকে। একদিন সন্ধ্যার পর মোড়ের দোকানগুলো বন্ধ না করায় পুলিশ এসে শাসিয়ে গেল আর যেন দোকান না খোলা হয়। এরপর থেকে নিয়ম মেনে দোকান খোলা-বন্ধ করা হচ্ছে। রাত গভীর হয় পাশের মোড়ে ওষুধের দোকানের মিটমিট করা লাইটটাও বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু আমার দুই চোখের পাতায় তখনো অজানা শঙ্কা। এভাবে রাত কেটে যায়।

সকালে ঘুম ভাঙতেই মায়ের ফোন। বাবা তুই সুস্থ আছিস? খাওয়ার সমস্যা হচ্ছে না তো? নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া কর। বাড়িতে চলে আয়। যদিও মা জানেন এখন চাইলে বাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়। প্রতিটি শহর এখন একে অপর থেকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন। তবু মন যে মানে না। আমি তখন ব্যর্থ চেষ্টা করি মাকে বোঝানোর।
হোম কোয়ারেন্টিনের এক মাস কেটে গেল। একদিন গভীর রাতে কালবৈশাখীর সঙ্গে বৃষ্টিতে ভিজিয়ে দিয়ে গেল পুরো শহরের শূন্য রাজপথ। আমি তখন আনমনে ভাবছি, এই কালবৈশাখী আর বৃষ্টির পানিতে কি এই শহরটা ধুয়েমুছে সুস্থ হবে? না, কিছু হবে না। তবু আশায় বুক বাঁধি।

সকালের নাশতা শেষ করে যখন ক্যাম্পাসে ছুটতাম, সেই সময় এখন খুলে বসি ল্যাপটপ কিংবা বই। কখনো গোয়েন্দা সিরিজ, কখনো ইতিহাস আবার কখনো কোরআন–হাদিস। কিন্তু মন বসাতে পারি না কোনোটাতেই। অনলাইন ক্লাসও এখন বন্ধ। ভাইয়ার বাসা কাছে থাকার পরেও যেতে পারছি না। এক অদৃশ্য শক্তি যেন আমাদের সবাইকে বেঁধে রেখেছে। থমকে গেছে শহর। চাইলেও পারছি না গ্রীষ্মের রোদ ঝলসানো তপ্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াতে। তাই দুপুর শেষে নিউজফিডে চোখ রাখি। দেখি বেড়েই চলেছে অজানা ভাইরাসের আক্রান্তের সংখ্যা। মৃত্যুর সংখ্যা এক শ ছাড়িয়েছে। এই মৃত্যুপুরীর মধ্যে এ যেন এক অন্য রকম বেঁচে থাকা।

লেখক: শিক্ষার্থী, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি