এবার শ্রীলঙ্কায় গির্জা ও হোটেলে সিরিজ বোমায় নিহত ২৯০

135

ঝুঁকির বাইরে নয় কোনো দেশই
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ইস্টার সানডেতে নজিরবিহীন সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কা। ভয়ংকর ওই হামলায় তিন শর মতো লোক নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছে। নিহত ও আহত মানুষের মধ্যে আছে বাংলাদেশিও। শ্রীলঙ্কার ওই হামলা সন্ত্রাসী তৎপরতার মানচিত্রে নতুন করে তুলে এনেছে দক্ষিণ এশিয়াকে। বিশ্বকে আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, ২০১৭ সালে বিশ্বের মোট সন্ত্রাসী হামলার ৩১ শতাংশই ছিল দক্ষিণ এশিয়ায়। ওই বছর সন্ত্রাসে নিহত ২৯ শতাংশই এ অঞ্চলের। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের সন্ত্রাসবিষয়ক প্রতিবেদনগুলোতে বরাবরই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয়েছে দক্ষিণ এশিয়াকে। এ কারণে পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের এই অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে সতর্ক করে আসছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের যে মাত্রার সতর্কতা অবলম্বন করার তাগিদ দেয়, ঠিক একই মাত্রার সতর্কতা জারি আছে বাংলাদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রেও।শ্রীলঙ্কায় গত রবিবারের ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সন্ত্রাসীদের কোনো বর্ণ, ধর্ম ও দেশ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বাংলাদেশে শ্রীলঙ্কার মতো কোনো হামলার আশঙ্কা নেই বলে জানালেও নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো অবকাশ নেই বলে জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা। সন্ত্রাসবিরোধী জোরালো অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশ প্রায় তিন বছর আগে বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশ এখনো এ দেশে হামলার উচ্চ মাত্রার ঝুঁকির কথা বলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘শ্রীলঙ্কার হামলা থেকে বাংলাদেশসহ সবার জন্য শিক্ষণীয় বিষয়টি হলো সন্ত্রাসী হামলা যেকোনো দেশে, যেকোনো জায়গায়, যেকোনো কারণে হতে পারে। তাই আমাদের গোয়েন্দা কর্মকা-ের ওপর দৃষ্টি দেওয়া দরকার। একইভাবে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়াতে গিয়ে বাংলাদেশ যেন আবার ভাবমূর্তি সংকটে না পড়ে তাও দেখতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে শ্রীলঙ্কায় গোয়েন্দা কার্যক্রম ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে। অতীতে আমরা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চেও এমনটি দেখেছি। তাই এ থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ আছে।’ রাষ্ট্রের স্বার্থে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার ওপর গুরুত্বারোপ করে ড. ইমতিয়াজ বলেন, ‘কোনো সন্দেহ নেই যে নজর রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে যাতে কোনো বিভাজন না থাকে। বিভিন্ন দল, উপদল যেন না থাকে। কারণ শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি, যত বেশি দল-উপদল হবে ততই কিন্তু আমরা নিজেরা সমস্যা তৈরি করতে থাকব। সেই জায়গায় আমাদের বড় ধরনের নজর দেওয়া উচিত।’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদার গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় বলেন, শ্রীলঙ্কায় হামলার ব্যাপারে এ যাবৎ যে ধরনের তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে তা থেকে বাংলাদেশের ওপর এখনই বড় ধরনের কোনো বিরূপ প্রভাব পড়ার বা শঙ্কিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তবে নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি এ দেশকেও সতর্ক হওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শ্রীলঙ্কায় হামলার সঙ্গে যদি আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি বা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর যোগসাজশ প্রমাণিত হয় তবে তা নতুন মাত্রা পাবে।
এ অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে আফগানিস্তানে সন্ত্রাসী হামলা নিত্যদিনের ঘটনা। সন্ত্রাসে মদদ দেওয়ার জন্য আঙুল তোলা হয় পাকিস্তানের দিকে। সন্ত্রাসী হামলা থেকে পরিত্রাণ পায়নি পাকিস্তানও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতেও বড় ধরনের সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে। এই অঞ্চলে কাশ্মীর সংকট ও রোহিঙ্গা সংকট সন্ত্রাসের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে সতর্ক করে আসছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। গত বছর সিডনিভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস প্রকাশিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ প্রতিবেদনে সন্ত্রাসের শিকার হওয়া অঞ্চলগুলোর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়া ছিল দ্বিতীয় শীর্ষস্থানে। ওই সূচকের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে আফগানিস্তান দ্বিতীয়, পাকিস্তান পঞ্চম ও ভারত সপ্তম স্থানে আছে। বাংলাদেশ আছে ২৫তম অবস্থানে। তবে গত রবিবার আক্রান্ত হওয়া শ্রীলঙ্কা ওই তালিকায় ৪৯তম স্থানে ছিল। শ্রীলঙ্কায় রবিবারের সন্ত্রাসী হামলা গত ১৫ বছরে এ অঞ্চলে সবচেয়ে বড় হামলা। ২০০৮ সালে ভারতের মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসী হামলায় প্রায় ১৫০ জন নিহত হয়েছিল। ২০১৪ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ারে সেনা পরিচালিত স্কুলে সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ১৫০ জন।