এনআরসিতে জ্বলছে ভারত

88

যুক্তরাজ্য-যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ : এক মঞ্চে মমতাসহ ৬ মুখ্যমন্ত্রী
সমীকরণ প্রতিবেদন:
সদ্যপ্রণীত নাগরিকত্ব আইন সিএবি-এর প্রতিবাদে বর্তমানে উত্তাল ভারতের আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গসহ বেশ কয়েকটি রাজ্য। এসব রাজ্যে হরতাল, অবরোধ, ট্রেন-বাসে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলেছেন সাধারণ মানুষ। বিক্ষোভ চলছে খোদ রাজধানী দিল্লীতেও। গত বৃহস্পতিবার রাতে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পরেই দেশের আইনে পরিণত হয়েছে বিতর্কিত নাগরিকত্ব বিল। এরই মধ্যে এই আইনের প্রতিবাদে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকা ‘গণআন্দোলনে’ সাড়া দিয়েছেন পাঞ্জাব, দিল্লি, কেরালা, ছত্তিশগড় ও মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীরা। তারা এই আইন না মানার ঘোষণা দিয়েছেন। দিল্লিতে ভারত বাঁচাও সমাবেশ করেছে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস। তারা সারা বিশ্বের এই আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়ার জন্য তাদের বিদেশ শাখাগুলোর প্রতি নির্দেশ দিয়েছে। ক্যাববিরোধী গণআন্দোলন বন্ধে ইতোমধ্যেই আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, মণিপুরের একাধিক জায়গায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে মোবাইল ও ইন্টারনেট পরিষেবা। রাজপথে বিক্ষোভে নেমেছে হাজার হাজার মানুষ। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫ জন বিক্ষোভকারী। এই পরিস্থিতিতে এই সমস্ত অঞ্চলে ভ্রমণের সময় গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হতে পারে যেকোনও সময়। তাই আপাত স্পর্শকাতর অঞ্চলগুলিতে পা না রাখার পরামর্শ দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসঙ্ঘ ক্যাবকে বৈষম্যমূলক আখ্যায়িত মুসলিমদের স্বার্থ সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে ভারতের বেশ কিছু রাজ্যে বিক্ষোভ হচ্ছে। খবরে জানা গেছে, ভারতের উত্তর-পূর্ব, বিশেষ করে আসাম ও ত্রিপুরাতে বিক্ষোভ বড় আকার নিয়েছে। গুয়াহাটিতে কারফিউ জারি করা হয়েছে ও আসামের ১০ জেলায় মোবাইল পরিষেবা বন্ধ। আগামী ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। তাই এই এলাকায় বেড়াতে গেলে সমস্যায় পড়তে পারেন পর্যটকরা।’ যুক্তরাষ্ট্রের সতর্কবার্তাতেও প্রায় একই কথা লেখা রয়েছে। তবে তারা আসামে এই মুহূর্তে কাউকে বেড়াতে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। নাগরিকত্ব (সংশোধিত) আইন বিরোধী বিক্ষোভে গত কয়েকদিন ধরে অগ্নিগর্ভ হয়ে রয়েছে আসাম। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও নিহতের খবর পাওয়া গেছে। আটক করা হয়েছে সহ¯্রাধিক মানুষকে। গ্রেফতার হয়েছেন ৬৫ জন। গোলমাল থামাতে গিয়ে বেশ কয়েকজন পুলিশকর্মীও আহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অশান্ত পরিবেশ নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মহলও। শুক্রবার বাংলাদেশের যুগ্ম কমিশনারের গাড়িতে ভাঙচুর চালানোর খবর প্রকাশ্যে আসে। ওই দিনই ভারত সফর বাতিল করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আগামী সপ্তাহে গুয়াহাটিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সম্মেলন স্থগিত রাখছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো অ্যাবে। জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতরও দাবি করেছে, দেশ থেকে মুসলিম নাগরিকদের সরাতে ভারতের এই নতুন নাগরিকত্ব আইন যথেষ্ট ‘বৈষম্যমূলক’।
মোদি সরকারের নয়া নাগরিকত্ব বিল ক্যাব-এর প্রতিবাদে গতকাল সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গে বিক্ষোভকারীরা কোথাও রেললাইন রুখে, কোথাও জাতীয় সড়কে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিবাদ করে। কোথাও আবার টায়ার জ্বালিয়ে এবং কুশপুতুল পুড়িয়েও প্রতিবাদ চলছে। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কখনও লাঠিচার্জ, কখনও বা টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটাতে হয় পুলিশকে। নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে গতকাল ৫টি খালি ট্রেনে লাগানো হয়েছে আগুন। মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা রেল স্টেশনে ট্রেন জ্বালিয়ে দেওয়ার ওই ঘটনায় পরিস্থিতি অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মানুষকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ-আন্দোলন করার আবেদন জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করবেন না, উত্তেজনা বা আতঙ্ক ছড়াবেন না, সাম্প্রদায়িক উস্কানিতে পা দেবেন না, এভাবেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আবেদন করতে দেখা যায় বাংলার মুখ্যমন্ত্রীকে। একই বার্তা দেন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড়ও। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যপালের আবেদনকে উপেক্ষা করেই নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা রাজ্য। সংবাদ সংস্থা আইএএনএস জানিয়েছে, মুর্শিদাবাদ জেলার পোড়াডাঙা, কুলগাছী বটতলা, জঙ্গিপুর এবং ফারাক্কা স্টেশন এবং হাওড়া জেলার দক্ষিণ পূর্ব রেলপথে বাউরিয়া ও নলপুর স্টেশনগুলিতে দফায় দফায় রেল অবরোধ করে বিক্ষোভকারীরা। পাশাপাশি তারা আগুন লাগিয়ে দেয় রাজ্য পরিবহন দফতরের অধীনস্থ তিনটি সরকারি বাস সহ পনেরোটি বাসে। প্রবল উত্তেজনা ছড়ায় এলাকায়।
নাগরিকত্ব আইনের প্রতিবাদে মুখ খুললেন বাংলার বিদ্বজ্জনেরা। একইসঙ্গে বিক্ষোভের নামে হিংসাত্মক ঘটনারও নিন্দা করেছেন তারা। গতকাল শনিবার বিকেলে ‘আলোপৃথিবী’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বিদ্বজ্জনেরা। এই সাংবাদিক বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন শুভাপ্রসন্ন, আবুল বাসার, জয় গোস্বামী, সুবোধ সরকার, প্রতুল মুখোপাধ্যায়, অভীক মজুমদার প্রমুখ। এ ছাড়া স্বাস্থ্যের কারণে উপস্থিত থাকতে না পারলেও বার্তা পাঠিয়েছেন সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। একযোগে প্রত্যেকেই মোদী সরকারের নয়া নাগরিকত্ব বিলের তীব্র প্রতিবাদ করেন। এই বিলকে ‘বৈষম্যমূলক’ আখ্যা দিয়েছেন তারা। এনআরসি-ক্যাব বিরোধী আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপরে আস্থা রাখার জন্য রাজ্যবাসীর কাছে আবেদন করেছেন সাহিত্যিক আবুল বাসার। তার বক্তব্যের প্রতিধ্বনী শোনা গিয়েছে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের বক্তব্যে। তিনি বলেন, এই আন্দোলনে মমতাকে চাই। তেমনই গোটা ভারতের মানুষকে একসঙ্গে ক্ষোভ দেখাতে হবে। না হলে এই বিপদকে দূর করা যাবে না। কবীর সুমন বলেন, রাজ্যের মানুষের প্রতি আবেদন করে বলেন, মরে গেলেও একটিও ডকুমেন্ট জমা দেবেন না।
ভারতে নাগরিকত্ব আইনের প্রভাব সম্পর্কে মার্কিন উদ্বেগ:
ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের প্রভাব সম্পর্কে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত মার্কিন কূটনীতিক স্যাম ব্রাউনব্যাক। গত শুক্রবার তিনি বলেন, ভারতে নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল কার্যকরী করার বিষয়টি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র খুবই উদ্বিগ্ন! লার্জ ফর ইন্টারন্যাশনাল রিলিজিয়াস ফ্রিডমের রাষ্ট্রদূত স্যাম ব্রাউনব্যাক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার বার্তায় বলেন, ‘ভারতের অন্যতম বড় শক্তি তার সংবিধান। গণতন্ত্র হিসেবে আমরা ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্মান করি। কিন্তু নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ফলাফল নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন!’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আশা করি সরকার ধর্মীয় স্বাধীনতা-সহ তার সমস্ত সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি মেনেই চলবে।’ আগামী সপ্তাহেই ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা রয়েছে। তার আগেই স্যাম ব্রাউনব্যাক ওই মন্তব্য করলেন। আগামী ১৮ ডিসেম্বর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং ওয়াশিংটন ডিসিতে মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব মাইক পম্পেও এবং প্রতিরক্ষা সচিব মার্ক এস্পারের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন বলে কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, জেনোসাইড ওয়াচের গ্রেগরি স্ট্যান্টন গত বৃহস্পতিবার ভারতীয়-আমেরিকান মুসলিম কাউন্সিল, এমগেজ অ্যাকশন এবং হিন্দুস ফর হিউম্যান রাইটস আয়োজিত একটি আলোচনা সভায় কাশ্মীর ও আসামের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আসামে থেকে মুসলিমদের বিতাড়নে নাগরিকত্ব আইনের বিষয়টির উল্লেখ করে গ্রেগরি স্ট্যান্টন বলেন, কাশ্মীর এবং আসাম উভয় ক্ষেত্রেই ‘চলমান গণহত্যা› ‘গণহত্যার দশ ধাপে›র নীতি অনুসরণ করে চলছে। ১৯৯৬ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরে কাজ করার সময় একটি উপস্থাপনা হিসেবে বিখ্যাত ‘জেনোসাইডের দশ ধাপ’ তৈরি করার জন্য সুপরিচিত ছিলেন গ্রেগরি স্ট্যান্টন। তিনি জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের রেজোলিউশনের খসড়াও তৈরি করেছিলেন যার উপর ভিত্তি করে রুয়ান্ডায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং বুরুন্ডি তদন্ত কমিশন তৈরি করা হয়েছিল।
কড়া প্রতিক্রিয়া জাতিসঙ্ঘের:
‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯’ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। নতুন আইনকে মৌলিকভাবে ‘বৈষম্যমূলক’ বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংগঠনের মানবাধিকার দফতর। ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯’-এ ভারতীয় সংবিধানের ‘সমানাধিকারের প্রতিশ্রুতি’ খুণœ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসের মুখপাত্রের তরফে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারত নাগরিকদের সমানাধিকার ও মানবাধিকার বজায় রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে ভারত নাগরিকদের সমানাধিকার রক্ষা করবে বলে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার কনভেনশন সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সাক্ষর করেছিল। কিন্তু, ‘নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ২০১৯’-এ সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার দফতর। জেনেভায় অ্যান্তোনিও গুতেরেসের অতিরিক্ত মুখপাত্র জানিয়েছেন, ভারতীয় সংসদের দুই কক্ষেই নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ হয়ে আইনে পরিণত হয়েছে। গোটা দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। বিষয়টির উপর নজর রাখা হয়েছে। এই আইনের ফলে সংখ্যালঘু মুসলিমদের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়।
এর আগে সোমবার মধ্যরাতে লোকসভায় নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাস হওয়ার পরই ‘ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনে’র অভিযোগে মার্কিন সরকারের কাছে অমিত শাহের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ জানায় মার্কিন কমিশন। লোকসভায় ক্যাব পাসের বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইউএসসিআইআরএফের তরফে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, “ক্যাবের মাধ্যমে অভিবাসীদের নাগরিকত্ব দেয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কিন্তু ধর্মের উপর ভিত্তি করেই আইনি যোগ্যতামান নির্দিষ্ট করার মাধ্যমে মুসলিমদের এই ব্যবস্থা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। ক্যাব আদতে ভুল পথে এগোনোর জন্য এক ভয়ঙ্কর পদক্ষেপ। ভারতের যে ধর্মনিরপেক্ষ, বহুত্ববাদী সুমহান অতীত রয়েছে, এই বিল তার পরিপন্থী। ধর্মীয় বিশ্বাসের উর্ধে উঠে সমানাধিকারের যে দর্শন ভারতীয় সংবিধান সুনিশ্চিত করেছে, এই বিল সেদিক থেকেও বিপরীতধর্মী।” নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে এবার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্র। ক্যাবের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করলেন মহুয়া মৈত্র, এমনটাই খবর। গত শুক্রবার দ্রুত মামলার শুনানির আর্জি খারিজ হয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রসঙ্গত, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের তীব্র বিরোধিতা জানিয়ে প্রথম থেকেই সরব হয়ে আসছে তৃণমূল। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরোধিতা জানিয়ে লাগাতার সোচ্চার হচ্ছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। কোনওভাবেই বাংলায় ক্যাব ও এনআরসি করা হবে না বলে বারংবার আওয়াজ তুলেছেন মমতা। এমনকী, লোকসভা ও রাজ্যসভায় ক্যাব পাসের সময়ও প্রথম সারিতে থেকে বিরোধিতা জানিয়েছে তৃণমূল। ক’দিন আগে বাংলার তিন কেন্দ্রে উপনির্বাচনে এনআরসি ও ক্যাবকেই হাতিয়ার করে জয়ের হাসি হেসেছে ঘাসফুল শিবির, এমনটাই ব্যাখ্যা রাজনৈতিক মহলের একাংশের। সেই প্রেক্ষিতে মহুয়া মৈত্রের ক্যাব মামলা রাজনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলকে চ্যালেঞ্জ করে প্রথম সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ (আইইউএমএল)। এই বিল দেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার খর্ব করেছে, এই অভিযোগ জানিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে তারা। ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগের তরফে শীর্ষ আদালতে পিটিশন জমা দিয়েছেন সাংসদ তথা সদস্য পি কে কুনালিকুট্টি, ই টি মহম্মদ বাশির, আবদুল ওয়াহাব এবং কে নাভাস কানি।
ভারত বাঁচাও আন্দোলনের ডাক কংগ্রেসের:
ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস দিল্লির রামলীলা ময়দানে ভারত বাঁচাও সমাবেশ আয়োজন করছে। সমাবেশে দলের নেতাদের ভাষণ শুনতে হাজির হয়েছেন হাজারো সমর্থক। এই সমাবেশে একই মঞ্চে হাজির হয়েছেন কংগ্রেসের অন্তবর্তীকালীন সভাপতি সোনিয়া গান্ধী, সাবেক সভাপতি রাহুল গান্ধী ও সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্র। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে এ খবর জানিয়েছে। সমাবেশে কংগ্রেস নেতারা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের সমালোচনা করেছেন। এই সমালোচনায় অর্থনীতি ও নারী সুরক্ষার বিষয়টি স্থান পেয়েছে। সমাবেশটি এমন সময় আয়োজিত হলো যখন বিজেপি শাসিত ঝাড়খন্ডে বিধানসভা নির্বাচন আসন্ন। সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, নাগরিকত্ব বিল ভারতের হৃদয় ছিন্নভিন্ন করবে। অথচ তা নিয়ে মোদি-অমিত শাহের কিছু যায় আসে না। ভারতকে বাঁচাতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামার আহ্বান জানান তিনি। সোনিয়া আরও বলেন, অবস্থা এখন এমন জায়গায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে যে, তারা চাইলেই একটি ধারা জারি করতে পারে, চাইলে একটি ধারা বাতিল করতে পারে এবং চাইলেই রাজ্যের প্রকৃতি পাল্টে ফেলে। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা জারি করছে। বিল পাস করছে বিতর্ক ছাড়াই।
রাহুল গান্ধীও নাগরিকত্ব আইনের সমালোচনা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, এর মধ্যদিয়ে মোদি উত্তর-পূর্ব ভারতে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন। ধর্ষণ নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে বিজেপি তাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বানের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, আমার নাম রাহুল সাবারকার নয়, রাহুল গান্ধী। সত্য বলার জন্য কখনও ক্ষমা চাইব না। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বলেছেন, দেশের চলমান অবিচারের বিরুদ্ধে যারা লড়াই করবে না তারা ভীতু। ভারত হলো ভালো, অহিংসা ও ভ্রাতৃত্বের দেশ। কিন্তু যখন যদি আতঙ্ক ও মিথ্যার বিরুদ্ধে সোচ্চার না হন তাহলে সংবিধান ধ্বংস হয়ে যাবে। বিজেপি-আরএসএস’র মিথ্যাবাদী ও বেপরোয়া নেতাদের মতোই আমরাও সেজন্য দায়ী থাকব।
সমাবেশে রাহুল গান্ধীকে ‘আমার নেতা’ উল্লেখ করে সরকারের ‘মোদি থাকলে সব সম্ভব’ সেøাগান নিয়েও ব্যঙ্গ করেন। তিনি বলেন, সব বাস স্টপ, সব পত্রিকায় দেখা যায় মোদি থাকলে সব সম্ভব। বাস্তবতা হলো বিজেপি থাকলে পেঁয়াজের কেজি ১০০ রুপি সম্ভব, বিজেপি থাকলে ৪৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব সম্ভব, বিজেপি থাকলে ৪ কোটি মানুষের চাকরি চলে যাওয়া সম্ভব। সমাবেশে সদ্য কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পি. চিদাম্বরমও বক্তব্য রাখেন।
এবার তোপ ভাইচুং ভুটিয়ার:
নাগরিকত্ব আইন বিতর্কে এবার মুখ খুলেছেন প্রাক্তন ফুটবলার তথা হামরো সিকিম পার্টির নেতা ভাইচুং ভুটিয়া। প্রাক্তন ভারত অধিনায়কের মতে, নাগরিকত্ব আইন সিকিমবাসীর স্বার্থ-বিরোধী। এর ফলে রাজ্যের বিশেষ মর্যাদাও ক্ষুণœ হতে পারে বলে আশঙ্কা তার। এক সাক্ষাৎকারে ভাইচুং জানান, ‘আমার মতে নাগরিকত্ব আইনের ফলে সিকিমের স্থানীয় মানুষের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।’ এ নিয়ে রাজ্যের শাসক ও বিরোধীদলের কী অবস্থান তাও জানতে চেয়েছেন তিনি। প্রসঙ্গত, সিকিমের শাসকদল আবার এনডিএ’র শরিক। প্রসঙ্গত, নাগরিকত্ব আইনের বিরোধিতা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছিলেন সিকিমের লোকসভার সাংসদ ইন্দ্র সুব্বা ও রাজ্যসভার সাংসদ হিসে লাচুংপা। তবে আপত্তিতে আমল দেয়নি কেন্দ্রীয় সরকার। সূত্র : এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বিবিসি।