এক মুঠো ভাতের তাগিদে ছুটে চলা ৮০ বছরের বৃদ্ধের কাহিনী ভাগ্যের পরিবর্তন আনতে পারেনি আমির ফকির

534
Exif_JPEG_420
Exif_JPEG_420
Exif_JPEG_420

বদরগঞ্জ প্রতিনিধি: এক সময় দু’টি পা অবশ হয়ে উঠে। কিন্তু তারপরও এক মুঠো ভাতের তাগিদে সব ক্লান্তিকে দুরে ঠেলে বাড়াতে হয় পা। ছুটতেই হবে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে, বাড়ি থেকে শত বাড়ি আর এভাবেই আমার ছুটে চলা। জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে এসেছি বটে কিন্তু ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব হয়নি। বরং সংসারে ৪টি ছেলে মেয়ে বুকে নিয়ে এখনও বেঁচে আছেন স্ত্রী। জায়গা জমি বলতে কিছুই নেই, কোন হালে দো-চালা একটি ঘর থাকলেও তা পরের দু-শতক জমির উপর। কথাগুলো এক নাগাড়ে বলে ফকির আমির আলি একটু হাপিয়ে উঠেন। কথার ফাকে জানতে চাইলাম, তো-চাচা আজ কত টুকু চাউল পেলেন? কথাটি শুনতেই হঠাৎ আমির ফকিরের দু’টি চোখের কোণায় জমে উঠলো চিকচিকে কিছু পানি। বুঝতে পারলাম সঙ্গত কারণেই চাচা অনেকটাই ভাবনার গভীরে চলে গেছেন। এবার আমির ফকির শুরু করে জীবনের শুরু থেকে শেষটা কি? যদিও অত কথা লেখা সম্ভব নয়। আমির ফকিরের বাড়ি চুয়াডাঙ্গা সদরের তিতুদহ ইউনিয়নের হুলেমারি গ্রামে। সম্পত্তি বলতে তার দেহটাই, জায়গা জমি না থাকায় পরের জমিতে বসবাস। পরিবারে ছয় জন সদস্য, লেখা পড়ায় রয়েছে তিন জন। আয়ের উৎস বলতে ছুটে চলা সারাদিনের মাঝে বাড়ি থেকে বাড়িতে ভিক্ষা বৃত্তি। কথার মাঝে সরকারী কোন অনুদান পেয়েছেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বয়স ৮০ বছর হলে কি হবে, কোন অস্তিত্বহারা মানুষ কোন অনুদান দক্ষিণা হিসাবে পেতে পারেনা, তাহলে ছত্র ছায়ার লোকেরা যাবে কোথায়? না বয়স্ক ভাতা, না পেয়েছি মাসিক ভাতা, না পেয়েছি বর্তমান সরকারের দেওয়া স্বল্প মূল্যের দশ টাকা কেজীতে চাউল? এমন কি সম্প্রতি ফকিরদের তালিকায়ই আমার নামটি উঠেনি! বড়ই লজ্জার কথা। তিনি আরো জানান, আমার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আক্তার সাহেবের নিকট স্বল্প মূল্যের চাউলের কথা বলাই জানিয়েদেন আমার পক্ষে সম্ভব নয়। একই সুরে কথা বলেন মেম্বর নঈমদ্দীন সাহেবও। তিনিও সাফ বলেছেন আমার পক্ষেও সম্ভব নয়। বিগত কিছুদিন আগে আকালে নামের পরিষদের এক চৌকিদার আমাকে কার্ড দেবার নাম করে ৫০ টাকা নিলেও আজও তা দেইনি। পরে আমার মতই কোন এক ভুক্তভোগীর কাছ থেকে শুনতে পারি বর্তমান পরিষদের যে কোন ধরণের কার্ড পাওয়া মানেই দিতে হবে দু’হাজার! যা আমার পক্ষে আদৌও সম্ভব নয়। তিনি আক্ষেপের সঙ্গে আরও জানান, অনেক সময় টাকার অভাবে আমার তিনটি স্কুল পড়–য়া সন্তানেরা বাড়িতে ফিরে আসে। এ ছাড়া জামা-কাপড়, বই-খাতা কলম তো কিনতেই হয়। দিনপাত চলে কোন হালে অনেক সময় না খেয়েও কাটাতে হয় রাত। আমার কষ্টের শেষ নেই যদিও-তবুও উপর ওয়ালাতো অবশ্যই আছেন। তিনিতো সব কিছুই বোঝেন, শোনেন ও দেখেন। অবশেষে তিনি দেশ স্বাধীনতার সময় কিছু কষ্টের কথাও তুলে ধরে বলেন, আমি ফকির মানুষ আইন গত ব্যবস্থায় মুক্তিযোদ্ধা হতে পারিনি বটে, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের জায়গা দেবার কারণে পাকিস্তানি সেনাবাহীনিসহ এদেশের দোষররা আমার বাড়ি-ঘর সমুলে পুড়িয়ে দেয়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা পালিয়ে গেলেও মারা যায় অনেকে। কালের স্বাক্ষী হিসাবে এখনও আমি বেঁচে রয়েছি। আমি একজন গরিব-দুঃখি ফকির হিসাবে অনুদানের কোন কিছু না পেলেও ভেবে নেবো, আমার থেকেও যারা নিচুতে আছে হয়তো তারাই পাচ্ছে এমন অনুদান। আর আমি পেলাম না এটাই হয়তো আমার কপাল।