উপকূলে বুলবুলের তীব্র আঘাত

18

বাড়ি-ঘর বিধ্বস্ত, বরগুনায় ১৫ জেলে নিখোঁজ, পশ্চিমবঙ্গে দুজনের মৃত্যু
সমীকরণ প্রতিবেদন:
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে আঘাত হেনেছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। বুলবুলের অগ্রবর্তী অংশ আছড়ে পড়ে সুন্দরবনের বঙ্গবন্ধু আইল্যান্ড, হিরণ পয়েন্ট, দুবলার চর, মেহের আলীর চর, অফিসকিল্লা, মাঝের চর, আলোর কোল, মরণের চরে। তছনছ করে দিয়েছে দুবলার চরের অস্থায়ী শুঁটকিপল্লী। বঙ্গোপসাগর উপকূলে গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় ঝড়ো হাওয়া শুরু হলেও সন্ধ্যা ৭টার দিকে বুলবুলের অগ্রবর্তী অংশ সুন্দরবনের সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাট অংশে আঘাত হানে। একই সঙ্গে পানির উচ্চতা বেড়ে যায় ৪ থেকে ৫ ফুট। ১২০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ক্রমেই বাড়তে থাকে ঝড়ের তীব্রতা। এদিকে বরগুনায় ট্রলারডুবিতে ১৫ জেলের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) দুবলার চর ভিএইচএফ স্টেশনের অপারেটর মো. কাশেম জানান, বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের দুবলার চরের অস্থায়ী শুঁটকিপল্লী এলাকার আলোর কোল, মেহের আলীর চর, মাঝের কিল্লা, অফিসকিল্লা ও শেলার চরে ২২ বছর আগে নির্মিত জরাজীর্ণ পাঁচটি ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রে ৬ হাজারের বেশি জেলে আশ্রয় নিতে পেরেছেন। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে সংকুলান না হওয়ায় শুঁটকিপল্লীর লোকজনসহ ঝড়ের কারণে সাগর থেকে আসা আরও কয়েক হাজার জেলে নৌযানে করে ছোট ছোট খালে আশ্রয় নিয়েছেন। ঝড়ের তীব্রতা বাড়ায় নৌযানে করে সুন্দরবনের খালে আশ্রয় নেওয়া জেলেদের সঙ্গে মোবাইলে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। অবশ্য সন্ধ্যায় বুলবুল ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনায় আঘাত হানে। রাত ১২টার দিকে পশ্চিমবঙ্গে অবস্থানের সময় খানিকটা দুর্বল হয়ে আসে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল।
এ রিপোর্ট লেখার সময় ঢাকার আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদরা বলেছেন, ঘূর্ণিঝড়টির কেন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের পর স্থলভাগের ওপর দিয়ে সাতক্ষীরা হয়ে বাংলাদেশ উপকূলে আঘাত হানবে। ভোররাতে বুলবুলের মূল কেন্দ্র বাংলাদেশ অতিক্রম করবে। অতিপ্রবল এ ঘূর্ণিঝড়টি বাংলাদেশ অতিক্রমের সময় এর কেন্দ্রে বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় দমকা ও ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১৪০ কিলোমিটারে বাড়বে। মধ্যরাতে আবহাওয়া অধিদফতরের বিশেষ বুলেটিনে বলা হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও সংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত ঘূর্ণিঝড় বুলবুল আরও উত্তর-পূর্ব দিকে প্রতি ঘণ্টায় ৮ কিলোমিটার বেগে অগ্রসর হয়ে কিছুটা দুর্বল হয়ে প্রবল ঘূর্ণিঝড় আকারে রাত ৯টা নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ-খুলনা উপকূল (সুন্দরবনের কাছ দিয়ে) অতিক্রম শুরু করে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৬৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়ার আকারে ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রবল ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের কাছাকাছি সাগর ছিল খুবই বিক্ষুব্ধ।
আবহাওয়া অধিদফতরের আবহাওয়াবিদ আবদুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড়টির ব্যাস ২০০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। মূল কেন্দ্রের ব্যাসও প্রায় ২০ কিলোমিটারের মতো। আবহাওয়াবিদ আয়েশা খানম বলেন, ঘূর্ণিঝড়টি যে বডি মুভ করছে, তার গতিবেগ ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটারের মতো। ঘূর্ণিঝড় উপকূলের কাছাকাছি যখন আসে, তখন সামনে ওর যে বডি মুভমেন্ট, তা কখনো স্লো, কখনো বেড়ে যায়। বুলবুল অতিক্রমের সময় সাগরে জোয়ার থাকবে বলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৫-৭ ফুট বেশি উঁচু জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছে আবহাওয়া বিভাগ। আবহাওয়াবিদ আয়েশা বলেন, যখন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের মূল কেন্দ্র আঘাত হানবে, তখন দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার বেগ হবে ১০০ থেকে ১২০ কিলোমিটার। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকাগুলোয় সকাল থেকেই বৃষ্টি ঝরছে; আবহাওয়ায় রয়েছে অনেকটা গুমোট ভাব, যা আইলার কথা মনে করিয়ে দেয় উপকূলবাসীকে। ১০ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গের সাগরদ্বীপ ও সুন্দরবন এলাকায় আঘাত হেনেছিল ঘূর্ণিঝড় আইলা। সেই ঝড়ের শক্তি ছিল বুলবুলের মতোই। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরের নি¤œাঞ্চল এই জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে। তাই প্রয়োজনীয় উদ্ধারকাজ ও অন্যান্য সেবা প্রদানের জন্য উপকূলের এসব জেলার প্রতিটিতেই সন্ধ্যা থেকে মোতায়েন রয়েছেন সেনা সদস্যরা।
শুধু সেনা মোতায়েন নয়, ঝড় মোকাবিলায় সার্বিক প্রস্তুতি নেয় সরকারের বিভিন্ন বিভাগ। উপকূলীয় বিভিন্ন জেলার ১৮ লাখ মানুষকে সন্ধ্যার আগেই ৪ হাজার ৭১টি আশ্রয় কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য বিভাগের ছুটি বাতিল করা হয়। মহাবিপদ সংকেত জারির পর সমুদ্রবন্দরগুলোয় কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়; অভ্যন্তরীণ নৌপথেও নৌযান চলা বন্ধ করে দেওয়া হয়। উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে। গতকাল সকালেই বাগেরহাটের মোংলা ও পটুয়াখালীর পায়রা সমুদ্রবন্দরকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলে আবহাওয়া অধিদফতর। উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোকে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেতের আওতায় রাখা হয়। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়। এর আওতায় ছিল চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর।
পশ্চিমবঙ্গে দুজনের মৃত্যু:
ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার বাতাসের গতি নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উপকূলে আঘাত হেনেছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের সাগর আইল্যান্ডে এটি আছড়ে পড়েছে। ঝড়ের তা-বে এখন পর্যন্ত অন্তত দুজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে জানিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ঝড়টি ইতিমধ্যে স্থলভাগে ঢুকে পড়েছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার উপকূলবর্তী এলাকায় ঝড়ের প্রকোপ বেড়েছে। ইতিমধ্যে বেশকিছু বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহু গাছপালা ভেঙে পড়েছে। উপড়ে গেছে বিদ্যুতের খুঁটি। নিচু এলাকাগুলোয় জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, পশ্চিমবঙ্গের স্থলভাগে প্রবেশের সময় ঘূর্ণিঝড়টির গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটারের কাছাকাছি। ফ্রেজারগঞ্জ ও বকখালী অঞ্চলে ক্ষয়ক্ষতি হয় বেশি। কলকাতা, হুগলি, নদীয়া, পূর্ব মেদিনীপুর এবং উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনায় আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি আরও বাড়বে বলেও জানানো হয়েছে। ইতিমধ্যে উপকূল এলাকা থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিয়েছে প্রশাসন।
ভোলার দুই উপজেলায় আহত ৮:
ভোলার লালমোহন ও চরফ্যাশন উপজেলায় ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তা-বে এবং দমকা বাতাসে সাতটি বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে আহত হয়েছেন অন্তত আটজন। এর মধ্যে তিনজনের পরিচয় জানা গেছে। এরা হলেন- লালমোহন উপজেলার পশ্চিম চরউমেদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুর রশিদ মাল, তার ছেলে ইমরান ও তিশান। চরউমেদের বাসিন্দা মো. ইবরাহিম জানান, রাত সাড়ে ৯টার দিকে প্রচ- বাতাস শুরু হয়। এতে আবদুর রশিদের বাড়ি ভেঙে পড়ে। গাছপালাও উপড়ে যায়। একই সময় ওসমানগঞ্জ ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল মোতালেব, তার ছেলে মামুন ও বিল্লাল এবং আবদুল মুনাফের বাড়িও বিধ্বস্ত হয়। বড় গাছগুলো রাস্তায় ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে লালমোহন উপজেলার লর্ড হার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চরপেয়ারীমোহন এলাকায় অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তাদের পরিচয় জানা যায়নি।
সেন্ট মার্টিনে আটকা দেড় হাজার পর্যটক:
ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাবে সাগর উত্তাল থাকায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলা বন্ধ করে দেয় প্রশাসন। এ কারণে শুক্রবার থেকে পর্যটকবাহী কোনো জাহাজ সেন্ট মার্টিনে চলেনি। ফলে সেখানে আগে থেকে অবস্থান করা দেড় হাজার পর্যটক ফিরতে পারেননি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেন্ট মার্টিনে আটকে পড়া পর্যটকদের ব্যাপারে নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হচ্ছে। তাদের সেখানে থাকা-খাওয়ায় যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের যাবতীয় সহযোগিতা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।’ আবহাওয়া স্বাভাবিক হলে তাদের ফেরত আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান। দ্বীপের ইউরো বাংলা রেস্টুরেন্টের মালিক জিয়াউল হক জিয়া বলেন, ‘আটকে পড়া পর্যটকদের আমার রেস্টুরেন্ট, এশিয়া বাংলা রেস্টুরেন্ট ও কোরাল ভিউ রেস্টুরেন্টে খাবারের বিলে অর্ধেক দাম রাখা হচ্ছে।’
৬০ বছরে দ্বিতীয়বার এমন ঘূর্ণিঝড়:
এবারের ঘূর্ণিঝড়টি অন্য ঘূর্ণিঝড়ের মতো নয়। ব্যতিক্রমী চরিত্রের এমন ঘূর্ণিঝড় সর্বশেষ ১৯৬০ সালের পর দ্বিতীয়বার জন্ম নিল। মূলত অন্য আরেকটি ঘূর্ণিঝড় থেকেই বুলবুলের জন্ম। ২৪ অক্টোবর ফিলিপাইন সাগরে জন্ম নেওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘মাতমো’ ৩০ অক্টোবর দক্ষিণ চীন সাগরে এসে বড় ঝড়ের আকার ধারণ করে। ৩১ অক্টোবর ভিয়েতনাম উপকূলে আঘাত হানে এটি। কোনো উপকূলে আঘাত হানার পর পশ্চিমমুখী ঘূর্ণিঝড়গুলো দুর্বল হতে থাকে এবং একপর্যায়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। ফলে কম্বোডিয়ার উপকূলে আঘাত হানার পর মাতমো বলতে গেলে একেবারেই দুর্বল হয়ে যায়। দুর্বল ঝড়টি ব্যাংককের ওপর দিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে আসে। এরপর আন্দামান সাগরে অনেকটা দৈবক্রমে মাতমোর অবশিষ্ট ঘূর্ণি পুনরায় শক্তি সঞ্চার করতে শুরু করে। একপর্যায়ে বৃহস্পতিবার প্রথম প্রহরের দিকে এটি নতুন ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয়, যার নাম দেওয়া হয় বুলবুল।