উত্তাল বুয়েট, আজ বুধবার সকালে আবার অবস্থান

13

সমীকরণ প্রতিবেদন:
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তাল বুয়েট। তাদের চলমান আন্দোলন গতকাল মঙ্গলবার রাতে স্থগিত করে আজ বুধবার সকাল থেকে আবার তা চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। রাত পৌনে ১০টার দিকে আন্দোলনকারীদের পক্ষ থেকে উপাচার্য সাইফুল ইসলামের কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়ার সময় কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে শিক্ষার্থীরা জানান, আজ বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় অবস্থান নিয়ে তারা আবার আন্দোলন শুরু করবেন। শিক্ষার্থীরা উপাচার্যের কার্যালয়ের তালা খুলে দিলে তিনি অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে মুক্ত হন। এর আগে সন্ধ্যায় ওই কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেন আন্দোলনকারীরা। এতে ভেতরে আটকা পড়েন উপাচার্য সাইফুল ইসলাম। এর আগে দিনভর উত্তাল থাকে বুয়েট। ক্যাম্পাস থেকে হত্যাকারীদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাসহ আট দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের দুর্বার আন্দোলনে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দাবির সমর্থনে বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে আজ বুধবারও বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় আবরারের প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভও করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। বিক্ষোভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আবরার ফাহাদের গায়েবি জানাজাও পড়েন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। সকাল থেকে আট দফা দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস-পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেন তারা। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানান বুয়েটের বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। ঢাবি ও বুয়েট ক্যাম্পাসে পূজার ছুটি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নেন।
আন্দোলনরতদের আট দফা দবি হলো- আবরারের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিষ্কার করা, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্নমত দমানোর নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা, ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পরও ভিসি কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি তা গতকাল মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে জবাব দেওয়া, আবরার হত্যা মামলার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করা, এর আগের ঘটনাগুলোর বিচার করা, ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা এবং বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা। বুয়েটের শেরেবাংলা হলে প্রভোস্ট পদত্যাগে সম্মত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া আগামী সাত দিনের মধ্যে বুয়েটে সব ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে আসেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ক্যাম্পাসে এলে আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ধরেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের জন্য তার কাছে দাবি জানান। তোপের মুখে পড়েন তিনি। তিনি স্বীকার করেন, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকার দরকার নেই। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।’ এ সময় শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা না বলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখান আন্দোলনকারী অনেকেই।
এক পর্যায়ে মিজানুর রহমান বলেন, তিনি উপাচার্যকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি অবহিত করবেন। তিনি বলেন, ‘আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছি’। এ সময় তাকে সেখানে ৫টা পর্যন্ত থাকার অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসার জন্যও তার কাছে অনুরোধ করেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ:
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে এমন অভিযোগ করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. একেএম মাসুদ। এর আগে আবরার হত্যাকা-ের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় শিক্ষকদের এ সংগঠন।
উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ:
শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম অনুসারে বিকেল ৫টার মধ্যে উপাচার্য উপস্থিত না হওয়ায় বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘিরে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে কার্যালয়ের গেটের ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকায় প্রবেশ করতে পারেননি তারা। পরে গেটের বাইরে থেকে আরেকটি তালা লাগিয়ে দিয়ে কার্যালয় সামনে অবস্থান নেন তারা। বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর বিকেল ৪টার পর থেকেই উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ওই সময় বিভিন্ন হল প্রভোস্টদের নিয়ে মিটিং করছিলেন। এদিকে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে না পারায় গেটের তালা ভেঙে প্রবেশ করার দাবিও জানায় শিক্ষার্থীদের একপক্ষ।
অপরপক্ষের দাবি, উপাচার্য নিজ থেকে এসে শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করুক। অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার পর শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি। শিক্ষার্থীরা নানা প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করেন। উপাচার্য বলেন, ‘তোমাদের দাবির বিষয়ে নীতিগতভাবে আমরা একমত। সবকটা দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। তোমরা অধৈর্য হয়ো না। দাবিগুলো বাস্তবায়নে আমরা কাজ করব। শিক্ষার্থীরা জানতে চান, ‘সোমবার আপনি আসেননি কেন?’ উপাচার্য বলেন, ‘আমি রাত একটা পর্যন্ত অফিস করেছি। তোমাদের জন্যই কাজ করেছি।’ এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের অধৈর্য না হওয়ার আহ্বান জানান। এ সময় তিনি সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা সবাই মিলে একসঙ্গে বসতে চান। এ সময় উপাচার্য সবাইকে নিয়ে বসা যায় না বলে জানান। শিক্ষার্থীরা তার আশ্বাসে আশ্বস্ত না হলে দাবি দ্রুত মেনে নিতে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে উপাচার্য স্থান ত্যাগের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাকে উপাচার্য কার্যালয়ে ঢুকতে বাধ্য করেন। এরপর তাকে কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন শিক্ষক।
এ সময় শিক্ষার্থীরা তাদের আট দফা দাবি না মানা পর্যন্ত আগামী ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ভর্তি পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। পরে প্রায় ৩ ঘণ্টা পর উপাচার্যের কক্ষের তালা খুলে দেওয়া হয়। এদিকে রাতে বুয়েট শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীরা মোমবাতি প্রজ্বালন করেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা রাতে ব্যাচভিত্তিক বৈঠক করে আজ বুধবার সকালে নতুন কর্মসূচি ও দাবিগুলো তুলে ধরবেন।