আসছে বিপুল ঘাটতির বড় বাজেট

57

সমীকরণ প্রতিবেদন:
আগামী অর্থবছরের জন্য আসছে বিপুল ঘাটতি নিয়ে বড় অঙ্কের বাজেট। ৫,২৩,১৯১ কোটি টাকার বাজেটে ২৭.৭৯ ভাগ ঘাটতি থাকবে। ঘাটতির এই অর্থ সঙ্কুলানের জন্য ব্যাংক থেকে ধার নিতে হবে ৫৪,৮০০ কোটি টাকা। তবে এই বাজেটে যারা কর দেন তাদের জন্য থাকবে সুসংবাদ। আগামী অর্থবছরে তাদের কর কমিয়ে দেয়া হবে বলে আশ্বস্ত করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। তবে যারা কর দেন না তাদেরকে করের আওতায় নিয়ে আসার ঘোষণাও থাকবে। আগামীকাল জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নানা সুসংবাদ-দুঃসংবাদের মধ্যে করের এই বিষয়টিও থাকবে বলে জানা গেছে। কাল বিকেল ৩টায় জাতীয় সংসদে ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটটি উপস্থাপন করা হবে। বাজেটের আকার প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা। যা জিডিপির ১৮ দশমিক ১ শতাংশ। এই বাজেটে ঘাটতি থাকবে এক লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। মোট বাজেটের অংশ হিসেবে এটি ২৭.৭৯ শতাংশ আর জিডিপির অনুপাত হিসেবে ৫ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকেই ঋণ নেয়া হবে ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। আর ঋণের সুদের জন্য আগামী অর্থবছরে ব্যয় করা হবে প্রায় ৫৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদের জন্য গুনতে হবে ৫২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা। আর বিদেশী ঋণের সুদ ব্যয় হবে ৪ হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার রয়েছে ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা করা হয়েছে। এর পরও নতুন বাজেটের আকার ১৮.২২ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়, অর্থমন্ত্রী তার বক্তৃতায় জাতীয় সংসদের স্পিকারের মাধ্যমে দেশবাসীকে বিভিন্ন বিষয়ে আশ্বস্ত করবেন। তিনি বলার চেষ্টা করবেন, রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও কর হার বাড়বে না, শুধু করের আওতা বাড়বে। যারা আগে কর দিতেন তারা এখন কম কর দেবেন আর যারা কর দিতেন না তাদের করের আওতায় আনা হবে। কর দেয়ার উপযুক্ত সবাইকে করের আওতায় এনে রাজস্ব আয় বাড়ানো হবে।’ তিনি বলবেন, সরকার চেষ্টা করবে কর দেয়ার যোগ্য প্রায় এক কোটি লোক যেন করের আওতায় চলে আসে আগামী বছর।
আগামী বাজেটের বিভিন্ন দিক
আয় কাঠামো:
সামষ্টিক আয়-ব্যয় ও ঘাটতি কাঠামো তিনটি সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। আয় কাঠামোয় উল্লেখ থাকবেÑ আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১১ শতাংশ, এনবিআর বহির্ভূত কর রাজস্ব ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ এবং কর বহির্ভূত রাজস্ব ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে আয় করা হবে।
ব্যয় কাঠামো :
বাজেটের পরিচালন ব্যয় হবে ৩ লাখ ২০ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা আর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) হবে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ব্যয়ের খাতভিত্তিক বিভাজন হবেÑ ভৌত অবকাঠামো, সামাজিক অবকাঠামো এবং সাধারণ সেবা কাঠামো।
বাজেট ঘাটতি অবকাঠামো :
নতুন বাজেট ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে এক লাখ ৪৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই ঘাটতি মেটানোর জন্য বৈদেশিক সূত্র ৬০ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ, অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৯ শতাংশ এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য ব্যাংক বহির্ভূত খাত থেকে ৩০ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক শূন্য শতাংশ সংগ্রহ করা হবে।
সম্পূরক বাজেট :
জানা গেছে, বিগত সময়ে গৃহীত জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের জনবল ও কর্মপদ্ধতিতে ব্যাপক সংস্কার সাধন এবং অর্থনৈতিক অবস্থার সুদৃঢ় অবস্থানে থাকবে ধরে নিয়ে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের রাজস্ব আহরণ ও ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রাজস্ব আয় প্রত্যাশার চেয়ে কিছুটা কম হবে । চলতি অর্থবছরের মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত আহরিত রাজস্বের পরিমাণ ছিল মূল বাজেটের বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রার ৫৪ দশমিক ৭১ শতাংশ। একই সময়ে সরকারি ব্যয় হয় বার্ষিক বরাদ্দের ৪৪ দশমিক শূন্য শতাংশ। বাজেট বাস্তবায়নের এই পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে যে সংশোধন ও সমন্বয় করতে হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ বাজেট ডকুমেন্টসে থাকবে।
সংশোধিত রাজস্ব আয় :
২০১৮-১৯ অর্থবছরের মূল বাজেটে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয় ৩ লাখ ৩৯ হাজার ২৮০ কোটি টাকা। অর্থবছরের জুলাই-মার্চ সময়ে রাজস্ব আদায় পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ২২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা কমিয়ে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা (জিডিপির ১২ দশমিক ৫ শতাংশ) করা হয়েছে। এনবিআর রাজস্বের ক্ষেত্রে আয় মুনাফার ওপর কর মূল্য সংযোজন কর ও আমদানি শুল্ক থেকে অর্জন আশানুরূপ না হওয়ায় এই সংশোধন আনা হয়েছে বলে জানা গেছে।
সংশোধিত ব্যয় :
চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে সর্বমোট সরকারি ব্যয়ের প্রাক্কলন করা হয় ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে এ ব্যয় ২২ হাজার ৩৭ কোটি টাকা কমিয়ে ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা (জিডিপির ৫ দশমিক ১৭ শতাংশ) নির্ধারণ করা হয়েছে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার ১ লাখ ৭৩ হাজার কোটি টাকা থেকে কিছুটা কমিয়ে ১ লাখ ৬৫ হাজার কোটি টাকায় নির্ধারণ করা হয়েছে (জিডিপির ৬ দশমিক ৫ শতাংশ)। অন্য দিকে পরিচালন ব্যয়সহ অন্যান্য ব্যয়ের প্রাক্কলন কমিয়ে ১৪ হাজার ৩৭ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সংশোধিত বাজেট ঘাটতি ও অর্থায়ন :
চলতি অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছিল ১ লাখ ২৫ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা (জিডিপির ৪ দশমিক ৯ শতাংশ)। সংশোধিত বাজেটে ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা (জিডিপির ৫ দশমিক শূন্য শতাংশ)। মূল বাজেট ঘাটতির বিপরীতে বৈদেশিক সূত্র থেকে অর্থায়নের প্রাক্কলন ছিল ৫৪ কোটি ৬৭ হাজার টাকা, যা সংশোধিত বাজেটে কিছুটা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৫ হাজার ২৭৯ কোটি টাকায় (জিডিপির ১ দশমিক ৮ শতাংশ) অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য সূত্র থেকে অর্থায়নের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার কোটি টাকা।
জানা গেছে, বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বার্ষিক বরাদ্দ ব্যয়ের উন্নতির কথা শুনিয়ে বলবেন, ‘আনন্দের বিষয় হলো যে পাইপলাইনে থাকা বৈদেশিক সাহায্যের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়ায় চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের এপ্রিল ২০১৯ পর্যন্ত প্রকল্প সাহায্যের ব্যবহার হয়েছে বার্ষিক বরাদ্দের প্রায় ৬১ দশমিক ১ শতাংশ, বিগত অর্থবছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪৭ দশমিক ৭ শতাংশ।’ নতুন অর্থবছরের বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ২০ শতাংশ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ অর্জিত হবে বলে আশা করছে সরকার। এ ছাড়া নতুন বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরিকল্পনা করেছে সরকার।