আসক্তি নয়, ফেসবুক থাকুক প্রয়োজনে

86

আমাদের দেশে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবনযাপনের এক অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফেসবুক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটা যেন মারাত্মক নির্ভরতা। দৈনন্দিন জীবনের প্রায় সবই ফেসবুকে তুলে দিয়ে বন্ধুদের জানানো, লাইক, কমেন্টস, মতামত প্রকাশধর্মী চিহ্ন উপভোগ করাটাই এখন আমাদের বিনোদনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাছাড়া দেশ ও জাতির ঘটে যাওয়া নানা বিষয়ে নিজেদের মতামত বা অবস্থান জানানো তো রয়েছেই। মার্ক জাকারবার্গ বন্ধুদের নিয়ে কী উদ্দেশে ফেসবুক চালু করেছিলেন? সেটি জানার তেমন প্রয়োজন নেই এদেশে। এখন কোনো কিছু ঘটলেই সে বিষয়টি নিয়ে আমরা ফেইসবুকে হুমড়ি খেয়ে পড়তেই বেশি ভালোবাসি। বর্তমান সময়ে নানা বিষয়ে আমাদের প্রতিবাদ, মতামত, বিপ্লব, প্রেম, ভালোবাসা, মানবতা প্রকাশের একমাত্র প্লাটফর্ম যেন ফেইসবুক! প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়াই যেন স্মার্টনেস! কিন্তু কেন? অনেকেই বলেন সহজে মতপ্রকাশের সুবিধার জন্যই ফেইসবুক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোনো কিছু লেখা বা প্রকাশ মানেই কি মতপ্রকাশ? যুক্তি দিয়ে আপনি যুক্তি খ-ন করতেই পারেন। কিন্তু তেমনটা ঘটে না ফেইসবুকে। বরং মূল বিষয়কে পাশ কাটিয়ে বুঝে, না বুঝে ব্যক্তিকে আক্রমণ করাটাই যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এ কাজে যারা যুক্ত থাকছেন তারা কি ভেবে দেখেছেন ফেইসবুকে প্রতিফলিত হচ্ছে আপনাদের চারিত্রিক গুণাবলি। ফেইসবুকে প্রত্যেকেই তার ওয়ালে নিজের চিন্তা বা মত প্রকাশ করেন। সেটি আপনার চিন্তা-চেতনার সঙ্গে মিলতে পারে, আবার নাও মিলতে পারে। সেটি মানতে হবে এমনটা তো নয়। তবুও আমরা প্রায়ই বিরুদ্ধচারণ করতে থাকি। এক সময় সেটি ব্যক্তিগত আক্রমণের পর্যায়ে গিয়েও ঠেকে। যেটি মোটেই কাম্য নয়। ফেইসবুকে আমরা কী পোস্ট করি? নিজের ছবি, পরিবারের ছবি, বেড়াতে গেলে সেখানকার ছবি, ভালো কোনো লেখা বা সংবাদ, নিজের অনুভূতি বা মত প্রভৃতি। যারা লেখালেখি করেন তারা প্রায়ই নিজের লেখাটি খুঁজে পান অন্যের পোস্টে, যেখানে ওই লেখাটিকে তিনি নিজের বলেই চালিয়ে দিচ্ছেন। কবিতা ও আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে এটি ঘটছে প্রবলভাবে। ফেইসবুক ব্যবহারে কর্তৃপক্ষ বয়সের সীমা দিয়ে রেখেছে। কিন্তু বয়স বাড়িয়ে আইডি খুলে ফেইসবুক ব্যবহার করছে এদেশের হাজার হাজার কোমলমতি শিক্ষার্থীও। ফলে মিথ্যা তথ্য দিয়েই শুরু হয় তাদের ফেইসবুক জীবন। অনেক শিক্ষিত অভিভাবকই তার সন্তানের হাতে তুলে দিচ্ছেন স্মার্টফোন। সে সুযোগে তারা সারাক্ষণ ডুবে থাকছে ফেইসবুকে। সেখানে নানা মিথ্যা তথ্য উল্লেখ করে নিজেকে বড় কিছু জাহির করানো ও নতুন নতুন বন্ধুত্ব স্থাপনে ব্যস্ত থাকছে তরুণ সমাজ। ফেইসবুকে এক ঘণ্টার চ্যাটিং মুঠোফোনেই আপনি সেরে নিতে পারেন মাত্র পাঁচ মিনিটে। অথচ তরুণদের অনেকেরই সারাক্ষণ কাটে চ্যাটিংয়ে। ফলে অল্প বয়সেই ঘাড় ও চোখের সমস্যাসহ লেখাপড়ায় উদাসীনতা এবং তাদের মনোজগতে তৈরি হচ্ছে বিরূপ প্রভাব, যা মাদকের আসক্তি থেকেও ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। স্মার্টফোন কিনে দেওয়া নয় বরং প্রত্যেক পরিবারের উচিত সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, তাদের বোঝানো ও সন্তানের ফেইসবুক ব্যবহারকে সীমিত বা বন্ধ রাখা। তা না হলে সন্তানকে নিয়ে বাবা-মায়ের স্বপ্নগুলো ফেইসবুকেই মুখ থুবড়ে পড়বে। এ তো গেল সন্তানদের কথা। সম্প্রতি একটি বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফেইসবুকের কারণে সংসারে অশান্তি ও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বিরোধ বাড়ছে। তৈরি হচ্ছে সন্দেহপ্রবণতা। স্বামী-স্ত্রী তাদের সম্পর্কের কাছে আর বিশ্বস্ত থাকছে না। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে বিয়ে-বিচ্ছেদের পরিমাণও, যা মোটেও কাম্য নয়। ফেইসবুকে আপনি সার্চ করেই খুঁজে পেতে পারেন আপনার কাক্সিক্ষত বন্ধুটিকে। এভাবে মিলে যায় হারানো বন্ধু, বান্ধবী, প্রেমিক, প্রেমিকা, নতুন কোনো বন্ধু। কিন্তু কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করবেন বা কাকে বন্ধু তালিকায় রাখবেন সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া উচিত বর্তমানকে ঘিরেই। ফেইসবুককে যদি একটি বাজার ভাবেন, তবে সেই বাজারে কেউ যাবে প্রয়োজনে, কেউ যাবে অপ্রয়োজনে, আবার কেউ কেউ যাবে বিভ্রান্তি ছড়াতে। তাই এসব কিছু বিবেচনায় রেখেই ইতিবাচক অর্থে ফেইসবুককে প্রয়োজনেই ব্যবহার করতে হবে। ফেইসবুকে আমরা যা করি তা আমাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকেই স্পষ্ট করে। তাই চলুন, ফেইসবুক আচরণে সংযত হই, যুক্তি দিয়েই নিজের যুক্তিকে প্রকাশ করি। আসক্তি নয়, ফেইসবুক থাকুক প্রয়োজনে। অধিক বন্ধুত্ব নয়, ভালো চিন্তার, ভালো মতের বন্ধুরাই থাক আমাদের ফেইসবুকে।