আলোকিত মানুষ ফারুখ হোসেন

178

অশিক্ষার অন্ধকার দূর করতে নিরলসভাবে কাজ করছেন
আরিফ হাসান:
এক যুগ আগেও চুয়াডাঙ্গা সদরের বৃহত্তর বেগমপুর ও তিতুদহ ইউনিয়নের মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষার আকাক্সক্ষা ছিল আকাশ ছোঁয়ার মতই। কৃষিনির্ভর জনপদে দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসরত অধিকাংশ পরিবার তাদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার স্বপ্ন দেখলেও অনুন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা ও আর্থিক সমস্যার কারণে তাঁদের মাঝপথে হোঁচট খেতে হতো বারবার। এ অঞ্চলে একাধিক প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল মাত্র দুটি। হিজলগাড়ী মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর তিতুদহ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পরিবর্তিতে আরও কয়েকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও মাধ্যমিকের গ-ি পেরিয়ে উচ্চমাধ্যমিকে শিক্ষা গ্রহণ এ প্রকার কষ্টসাধ্য ব্যাপার ছিল এ বৃহত্তম এলাকার মানুষের জন্য। তিতুদহ ইউনিয়নের বাটিকাডাঙ্গা গ্রাম থেকে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজের দূরত্ব প্রায় ৩০ কি.মি. আর দর্শনা সরকারি কলেজের দূরত্বও প্রায় সমপরিমাণ। এসব কারণে এ এলাকায় মাধ্যমিক পাস শিক্ষিত মানুষের সংখ্যার এক তৃতীয়াংশেরও কম জনগণ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছে।
এ বৃহত্তম অঞ্চলের জনগণের অভাবনীয় দুর্ভোগ কমাতে প্রয়োজন ছিল একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কলেজের। কিন্ত উদ্যোগ গ্রহণ করার মানুষের অভাব ছিল পরতে পরতে। ঠিক এ সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করে চাকরির পেছনে না ঘুরে এলাকার মানুষের স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে এলেন বড়শলুয়া গ্রামের ফারুখ হোসেন। এ মানুষটিই এখন এ অঞ্চলের আলোকবর্তিকা। নিজের পৈতৃক সম্পত্তি ৯ বিঘা জমি বিনিময় করে ৩ বিঘা জমির ওপর ইটের দেয়াল আর টিনের ছাউনি দিয়ে ২০০৪ গড়ে তোলেন বড়শলুয়া নিউ মডেল কলেজ। প্রথমে নিন্দুকদের কড়া সমালোচনা, রম্য-হাস্য আর রাজনৈতিক বিরোধিতা থাকলেও একসময় সব কিছুকে পেছনে ফেলে হয়ে উঠলেন এ এলাকার শিক্ষার দূত। একে একে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেছেন দুটি কলেজ, একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়, একটি পাঠাগার ও একটি সেবামূলক স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বড়শলুয়া গ্রামের মরহুম ফরজুন আলী মাস্টারের দুই সন্তানের মধ্যে ফারুখ হোসেন সবার বড়। ২ মে ১৯৭১ সালে জন্মগ্রহণ করা ফারুখ হোসেন ১৯৮৭ সালে ডিঙ্গেদহ সোরয়াদি স্মরণী বিদ্যাপীঠ থেকে ২য় বিভাগে মেট্রিক পাস করেন। এরপর ১৯৯০ সালে চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজ থেকে ২য় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি হন। ১৯৯৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও পরের বছর ১৯৯৮ সালে মাস্টার্স সম্পন্ন করে নিজ এলাকায় ফিরে আসেন তিনি।
এলাকায় ফেরার পর ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠান করেন বড়শলুয়া নিউ মডেল কলেজ, যা বর্তমানে ডিগ্রি কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। কলেজ প্রতিষ্ঠার ধাক্কা সামলে ওঠার আগে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়ে ফেলেন আপন ছোট ভাই আরাফাত হোসেনকে। তখন হঠাৎ করেই থেমে যায় তাঁর সব পরিকল্পনা। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি আবার ফিরে আসেন তাঁর স্বপ্নের পথে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছোট ভাই আরাফাত হোসেন আরিফের নামে নিজ গ্রামে ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন আরাফাত হোসেন স্মরণীয় বিদ্যাপীঠ নামের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই জনপদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বীর মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি (বিএম) কলেজ। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয়, এলাকার মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে তিনি প্রিয় ছোট ভাইয়ের নামে ২০১৫ সালে গড়ে তোলেন আরাফাত স্মৃতি ওয়েলফেয়ার সোসাইটি নামক একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও। একই বছর নিজ পিতার নামে গড়ে তোলেন একটি উন্মুক্ত পাঠাগার, যার নাম দেন মরহুম ফরজুন মাস্টার স্মৃতি পাঠাগার। ফারুখ হোসেন আরাফাত স্বৃতি ওয়েলফেয়ার সোসাইটির মাধ্যমে নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছেন এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা সহায়তায় দেওয়ার জন্য একটি হাসপাতাল এবং ধর্মীয় শিক্ষা প্রসারের জন্য একটি মাদ্রাসা গড়ে তোলার। বর্তমানে তিনি নিরলসভাবে কাজও করছেন এগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য।
একান্ত আলাপচারিতায় এ স্বপ্নবাজ শিক্ষানুরাগী ফারুখ হোসেন সময়ের সমীকরণকে বলেন, ‘আমার পিতা একজন স্কুল শিক্ষক। তিনি স্বপ্ন দেখতেন আমাদের এলাকার মানুষ নিজ এলাকাতেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করবে। আমি তাঁর স্বপ্নগুলো পূরণে কাজ করছি। আমার এলাকার একজন মানুষও যেন শিক্ষা থেকে বঞ্চিত না হয়।’
এ বিষয়ে কথা হয় এ অঞ্চলের প্রথম উচ্চশিক্ষিত (বিএ পাস) ব্যক্তি কোটালী গ্রামের ইসাহক আলী মাস্টারের সঙ্গে। তিনি সময়ের সমীকরণকে বলেন, ‘আমাদের এলাকা মূলত কৃষিপ্রধান, আজ থেকে ২০ বছর আগে আমাদের এলাকার মানুষের কাছে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের বিষয়টি ছিল আকাশ ছোঁয়ার মতই কঠিন কাজ। ফারুখ হোসেনের প্রচেষ্টায় আমাদের এলাকার মানুষ আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। আমাদের এলাকার ছেলেমেয়েরা বাড়ির কাছের কলেজে পড়তে পারবে, এটা অতীতে আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।’
এ এলাকার প্রথম বিসিএস ক্যাডার চক্ষু চিকিৎসক ডা. ফকির মোহাম্মদ বলেন, ‘আমাদের এলাকা থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা যে কত কষ্টকর ছিল, তা শুধু ভুক্তভোগীরাই বলতে পারবেন। আমাদের সময়ে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পরে ঝরে পড়েছে। ফারুখ হোসেন আমাদের এলাকার চিত্রই পাল্টে দিয়েছেন।’
বড়শলুয়া নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজের প্রভাষক আশাদুল ইসলাম বলেন, ‘ফারুখ হোসেনের কারণে যেমন আমাদের এলাকার মানুষ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়েছে, তেমনইভাবে আমাদের মতো যুবকেরা পেয়েছে নিজ এলাকায় চাকরি করার সুযোগ।’
মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি বিএম কলেজের অধ্যক্ষ নাফিয়া ইয়াসমিন বলেন, ‘খুব কাছ থেকে ফারুখ হোসেনকে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি যেভাবে এলাকার মানুষকে নিয়ে ভাবেন, এভাবে যদি আমাদের সমাজের সবাই ভাবতো, তাহলে শিক্ষা, চিকিৎসাসহ সব ক্ষেত্রে আমাদের দেশ আরও এগিয়ে যেত।’