আর কত প্রাণ ঝরলে সড়কে নৈরাজ্য থামবে?

39

সড়কে অব্যবস্থার করুণ পরিণতির শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে রাজধানীতে বাস চলাচল বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। জননিরাপত্তার স্বার্থে এই নৈরাজ্য দমন করতে হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে বারবার উদ্যোগ নিলেও তা চোখে পড়ছে না। বিভিন্ন কমিটির দফায় দফায় করা সুপারিশগুলো আলোর মুখ দেখছে না। উন্নত বিশ্বে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যেসব পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সেগুলো খুবই সুনির্দিষ্ট হয়। কিন্তু আমাদের দেশে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন দায়সারা গোছের। কত বছরে কী পরিমাণ দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি কমানো হবে। কীভাবে তা অর্জিত হবে, কারা তা সফল করবে, এটা স্পষ্ট করা দরকার। প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং এর গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্যক উপলব্ধি করে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকে সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর অনুমোদন দিয়েছেন। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পরিস্থিতির আশানুরূপ উন্নতি নেই বললেই চলে। জানা যায়, ‘সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল’ ২০১১ সালে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে এই কাউন্সিল ৫২টি স্বল্পমেয়াদি, ১৪টি মধ্যমেয়াদি ও ২০টি দীর্ঘমেয়াদিসহ মোট ৮৬টি সুপারিশ করে। এসবের কোনোটাই বাস্তবায়ন হয়নি। সাড়ে ৬ বছর পর সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানের নেতৃত্বে গঠিত এই সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল গত সপ্তাহে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১১১টি সুপারিশ সরকারের কাছে জমা দিয়েছে। এখন ১১১টি সুপারিশ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে নানা প্রশ্ন রয়েছে। পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এই কাউন্সিল বিভিন্ন সময়ে যেসব সুপারিশ করেছে, সরকার সেগুলো বাস্তবায়ন করলে আজ সড়কে নৈরাজ্য-বিশৃঙ্খলা কম হতো। অন্যদিকে দেশের সুশৃঙ্খল সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বিআরটিএ ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমরা মনে করি, বিআরটিএ স্বচ্ছ হলে সড়ক-মহাসড়কে নৈরাজ্য কমে আসবে। গাড়ির রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, রুট পারমিট, ট্যাক্স টোকেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স, মালিকানা বদলসহ বিভিন্ন কাজে বিআরটিএর শরণাপন্ন হতে হয়। সড়ক দুর্ঘটনার বড় কারণ ফিটনেসবিহীন গাড়ি এবং অদক্ষ ও অবৈধ চালক। বিআরটিএ আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে এখনো এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি। এই সংস্থার একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে জাল সিল ও ট্যাক্স টোকেন সৃজন, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত নথি গায়েব, শুল্কবিহীন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয় ইত্যাদির দৃষ্টান্তও আছে। এখানে ঘুষ, দুর্নীতি, অনিয়ম, হয়রানি, ভোগান্তি আর দালালদের তৎপরতা চললেও তা দেখার এবং এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কেউ যেন থেকেও নেই। বিশেষ করে পরিবহন ব্যবস্থায় যে নৈরাজ্য, তার পেছনে রয়েছে শত শত কোটি টাকার বাণিজ্য। এর সঙ্গে জড়িত সরকারি আমলা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, এমনকি ছিঁচকে সন্ত্রাসী চাঁদাবাজরা। এদের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সঠিক আইন প্রণয়ন ও এর যথাযথ প্রয়োগ। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সমাধানের অযোগ্য কোনো বিষয় নয়। এ জন্য দরকার ইতিবাচক চিন্তা ও সমন্বিত পদক্ষেপ। এ জন্য পরিবহন মালিক, শ্রমিকদের পাশাপাশি যাত্রীদের সচেতন হতে হবে এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।