আমের মুকুলে দোল খাচ্ছে কৃষকের স্বপ্ন : বাতাসে ভাসছে মন মাতানো ঘ্রাণ

517

এ বছর চুয়াডাঙ্গায় ১৬ হাজার ৯২ হেক্টর জমিতে আবাদ : উৎপাদন হবে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার মে.টন আম
শামসুজ্জোহা পলাশ/ আফজালুল হক:ঝড়ের দিনে মামার দেশে, আম কুড়াতে সুখ, পাকা জামের মধুর রসে, রঙিন করি মুখ। পল্লীকবি জসীম উদ্দিনের “মামার বাড়ি” কবিতার পঙ্গোক্তিগুলো বাস্তব রূপ পেতে বাকি রয়েছে আর মাত্র কয়েক মাস। তবে সুখের ঘ্রাণ বইতে শুরু করেছে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে এ মুকুলের পাগল করা ঘ্রাণ। ফালগুনি হাওয়ায় থোকায় থোকায় দুলছে আমের মুকুল। শীতের শেষে আম গাছের কচি ডগা ভেদ করে সবুজ পাতার ফাঁকে হলদেটে মুকুল গুচ্ছ যেনো উঁকি দিয়ে হাসছে। বাগানের সুনসান নীরবতা চিরে একটানা গান শোনাচ্ছে মৌমাছি। মুকুলের মৌ মৌ গন্ধে মৌমাছির গুনগুন শব্দে মুখরিত আম বাগান। যে গন্ধ মানুষের মন ও প্রাণকে বিমোহিত করে তুলেছে। শহর কিংবা গ্রামে সর্বত্র আমগাছ তার মুকুল নিয়ে হলদে রঙ ধারণ করে সেজেছে এক অপরূপ সাজে। কয়েক দিনের মধ্যে আমের মুকুল পরিণত হবে এক পরিপূর্ণ দানায়। আমের মুকুলে কৃষকের আগামীর স্বপ্ন দোল খাচ্ছে। সেই সোনালি স্বপ্নকে বুকে ধারণ করেই বাগান পরিচর্যায় ব্যস্ত চুয়াডাঙ্গার আম বাগান চাষিরা।
বিভিন্ন এলাকা ও আম বাগান ঘুরে দেখা গেছে, গাছে গাছে নানা ফুলের সঙ্গে আমের মুকুলের মিষ্টি ঘ্রাণ আকাশে বাতাসে মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা করে তুলেছে। মুকুলের সেই সুমিষ্ট সুবাস নাড়া দিচ্ছে মানুষের হৃদয়েও। বনফুল থেকে মৌমাছির দল গুণগুণ করে ভিড়তে শুরু করেছে এসব আমের মুকুলে। গাছের শাখার পর শাখায় মুকুলগুলো চারদিকে যেন বসন্তের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ আমের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু সময় অনেকটা পাল্টে গেছে। এখন এ তালিকায় চুয়াডাঙ্গা জেলা নিজের স্থান করে নিয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হচ্ছে নানা জাতের আম। লাভজনক হওয়ায় প্রতিবছরই আম চাষের জমি বাড়ছে। জেলার আম বাগান বা ব্যক্তি মালিকানায় গড়ে ওঠা প্রায় প্রতিটি গাছেই কম-বেশি মুকুল ধরেছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬-১৭ অর্থবছরে জেলাতে ১৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছিলো। যেখান থেকে আম উৎপাদন হয় ১ লাখ ৯২ হাজার মে.টন। এ বছর আমের আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৯২ হেক্টর জমিতে। গত বছরের তুলনায় এ বছর ৯২ হেক্টর জমিতে বেশি আমের আবাদ হয়েছে। যেখান থেকে আম উৎপাদন হবে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার মে.টন আম। এ জেলাতে প্রধান প্রধান আমের আবাদ হচ্ছে, আ¤্রপালি, লেংড়া, ফজলি, হাড়িভাঙা, মল্লিকা, থাই, গোপালভোগ, বারি ১০, দেশি, বেনারসি সিতাভোগ ইত্যাদি জাতের আম চাষ হয়েছে। এর মধ্যে সিংহভাগই আ¤্রপালি।
এ বিষয়ে চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার নতিপোতা ইউনিয়নের হোগলডাঙ্গা গ্রামের আম চাষি আনিছুজ্জামান বলেন, এবছর আমার আম গাছে প্রচুর পরিমাণে মুকুল ধরেছে। এখন পর্যন্ত আমের মুকুলে কোনো রোগ-বালাই আক্রমণ করেনি। আবহাওয়াও ভালো। যদি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না আসে আশা করছি প্রতিটি আম গাছেই পর্যাপ্ত পরিমাণে আম ধরবে। গত বছর সাড়ে ১৫ বিঘা জমিতে আমের বাগান ছিলো। যা বিক্রি করেছিলাম ৭ লাখ টাকায়। এবছর ২০ বিঘা আমের বাগান আছে। এলাকাতে ফসলি চাষের জমি রেখে অনেকেই আম বাগান করেছে।
একই ইউনিয়নের নতিপোতা গ্রামের আম চাষি আব্দুর রাজ্জাক জানান, মূলত আমেল ফলন ভাল পেতে হলে আমগাছের পরিচর্যা শুরু করতে হয় আম শেষ হওয়ার সাথে সাথে। যেমন, গাছের পুরাতন বোটা ভেঙে ফেলা। বাগানে চাষ ও সেচ দেয়া। পাতা পরিষ্কার রাখা। মুকুল আসার আগে এবং পরে ওষুধ ¯েপ্র করা হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার বালিয়াকান্দি গ্রামের আম চাষি মনিরুজ্জামান জোয়ার্দ্দার টিটু বলেন, ‘এ বছরের আবহাওয়া আমের মুকুলের জন্য বেশ অনুকূল। তাই একটু আগেভাগেই মুকুল এসেছে গাছে। গতবারের মতো এ মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়ার তেমন বিপর্যয়ও ঘটেনি। আশা করছি- ফাগুণের সাথে সাথে সব আম গাছ মুকুলে ভরে উঠবে।
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার আম গাছে খুব একটা কীটনাশক প্রয়োগের প্রয়োজন হবে না। তবে ছত্রাকজনিত রোগে আমের মুকুল ও গুটি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাগানে দু’ দফা ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হবে। এতে ছত্রাক জাতীয় রোগ থেকে আমের মুকুলগুলো রক্ষা পাবে। সেই সাথে আমের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে।
বাগান মালিক মনি ও বকুল জানান, সপ্তাহ খানেক আগে তাদের বাগানে লাগানো আম গাছে মুকুল আসা শুরু হয়েছে। বেশিরভাগ গাছ মুকুলে ছেয়ে গেছে। কিছু গাছে গাছে মুকুল বের হচ্ছে। তারা জানান, মুকুল আসার পর থেকেই তারা গাছের প্রাথমিক পরিচর্যা শুরু করেছেন। মুকুল রোগ বালাইয়ের আক্রমন থেকে রক্ষা করতে স্থানীয় কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ স্প্রে করছেন তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক নাঈম আস সাকীব জানান, জেলায় এ বছর আমের উৎপাদন ভালো হবে। কারণ এ বছর আমের মুকুল ধরার সময় প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ এখন পর্যন্ত দেখা দেয়নি। এমনকি তেমন কোনো রোগ-বালাইও হয়নি। অন্যান্য বছরের তুলনায় বাড়তি সতর্কতাও আছে আমাদের। যদি প্রাকৃতিক কোনো দুর্যোগ না হয় তাহলে কৃষকরা বা¤পার ফলন পাবেন বলে তিনি মনে করেন। তিনি আরও বলেন, আম চাষে সহজেই লাভবান হওয়া যায়। যার কারণে অনেকই এ পেশায় এগিয়ে আসছেন। বর্তমানে জেলাতে আবাদি জমিতে আমের চাষ (বাগান) করা হচ্ছে। আমের ভাল ফলন পেতে আমরা কৃষকদের বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দিচ্ছি। এ জন্য মাঠ পর্যায়ে আমাদের অফিসাররা কাজ করছেন।