আবারও বাড়ছে করোনা সংক্রমণ: বালাই নেই স্বাস্থ্যবিধির

82

সংক্রমণ বাড়ার শঙ্কা, মাস্ক ছাড়াই চলছে মানুষ, কর্মক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’
সমীকরণ প্রতিবেদন:
দেশে আবারও বাড়ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণ। কিন্তু এ ভাইরাস নিয়ে মানুষের মধ্যে নেই কোনো সচেতনতা। সরকার ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ ঘোষণা করেছে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষায় চলছে প্রচারণা। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানাও করা হচ্ছে। তারপরও রাজধানীসহ সারা দেশে মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারের বালাই নেই। অফিস-আদালত, গণপরিবহন, হাট-বাজার, বিপণিবিতান, মার্কেট, লঞ্চ-স্টিমার কোথাও মানা হচ্ছে না স্বাস্থ্যবিধি। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার আরও বাড়তে পারে। তবে ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্ক ব্যবহারসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে এ সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। এ জন্য সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার পরামর্শ স্বাস্থ্যবিদদের। একইসঙ্গে মাস্ক পরাতে বাধ্য করার জোরালো দাবিও জানান তারা।
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেন, ‘করোনাভাইরাস প্রতিরোধে অবশ্যই সবাইকে মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। সরকার শুধু মুখে বললেই হবে না, বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহারের জন্য কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মাস্ক পরলে ৯৫ ভাগ করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমি মনে করি, এই মহামারীর সময় রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির চাইতে জনগণকে মাস্ক ব্যবহারে সচেতন করাই উত্তম।’ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। মাস্ক পরেন না অধিকাংশ মানুষ। কেউ কেউ থুতনিতে মাস্ক পরেন। সড়কে বিপুল সংখ্যক ব্যক্তিগত গাড়ি, সিএনজি অটোরিকশা চলাচল করছে। দাপিয়ে বেড়াচ্ছে রিকশা। কোথাও মানা হচ্ছে না সামাজিক দূরত্ব। আদালতপাড়ায় হাজার হাজার বিচারপ্রার্থী ও তাদের স্বজনদের ভিড়। কারও মুখে নেই মাস্ক।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইউজিসি অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ বলেন, শীত শুরুর আগেই করোনার সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। মৃত্যুর ঘটনাও বেড়েছে। করোনাভাইরাস থেকে বাঁচতে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত একমাত্র সচেতনতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনার সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব। তিনি বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে তিনটি বিষয় আবশ্যক। বাইরে বের হলে, অফিসের কাজের সময়, ভিড়ের মধ্যে, বাজারে সবসময় মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। মাস্ক পরলে ঝুঁকি অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, ২০ সেকেন্ড সাবান কিংবা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত ধুতে হবে। হাত না ধুয়ে বাইরে থাকা অবস্থায় নাক, মুখে দেওয়া যাবে না। সাবান না থাকলে স্যানিটাইজার ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামাজিক দূরত্ব মানা। কেনাকাটা করতে গিয়ে বাজারে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। গাদাগাদি করে থাকলে করোনা সংক্রমণ আরও বেশি ছড়াবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ডা. লিয়াকত আলী বলেন, করোনাভাইরাসের হাত থেকে বাঁচতে মাস্ক পরা আবশ্যক। অবহেলা করোনা ঝুঁকি বাড়িয়ে দেবে। মাস্ক না পরে হাঁচি-কাশি দিলে জীবাণু কণা অর্থাৎ ড্রপলেট ছড়িয়ে পড়বে। আর্দ্রতা কম থাকায় ড্রপলেট দ্রুত শুকিয়ে অ্যারোসল অর্থাৎ ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হবে। এসব জীবাণু মিশ্রিত ক্ষুদ্রকণা বাতাসে ভাসমান থেকে সংক্রমণ বাড়াবে। অনেক সময় মাস্কেও এত ক্ষুদ্রকণা ঠেকানো সম্ভব হয় না। এতে বাতাসের মাধ্যমে জীবাণুর সংক্রমণ বাড়বে। অন্য সময় দ্রুত মাটিতে ড্রপলেট পড়ে যেত কিন্তু শীতে তা হবে না। শীতে ধুলাও বেড়ে যায়।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, করোনা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই কারও। মাস্ক ছাড়াই চলছে বেচা-কেনা। ক্রেতা-বিক্রেতা অধিকাংশের মুখেই মাস্ক নেই। বাঁধাকপি, ফুলকপি, টমেটোর পাইকারি আড়তে কাজ করছিলেন মাইদুল ইসলাম। তিনি দাঁড়িপাল্লায় টমেটো মাপছেন। সামনে বস্তা ধরে আছেন সুমন নামে এক কর্মচারী। পাশে সবজি কেনার জন্য দাঁড়িয়েছিলেন রামপুরা বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী সাইফুল শেখ। তিনজনের মুখেই মাস্ক নেই। মাস্ক ছাড়া এই ভিড়ের বাজারে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে মাইদুল ইসলাম বলেন, কাজের সময় মুখে মাস্ক পরি না। মাস্ক পরে কাজ করতে অসুবিধা হয়। কাজের চাপ কমলে মাস্ক পরব। এখান থেকে করোনা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে জানেন কিনা জিজ্ঞেস করলে বলেন, ভয় তো লাগে। কিন্তু আমাদের কাজই তো পাইকারি বাজারের ভিড়ে। এ জন্য মাস্ক মাঝেমাঝে পরি।’ একই অবস্থা অন্য দোকানদারদেরও।