আত্মহত্যায় মুক্তি খুঁজছে শিক্ষার্থীরা।

132

সমীকরণ প্রতিবেদন:
সম্পদ জীবনকে সুন্দর আর সুখকর করে গড়ে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে প্রতিটি মানুষ। কিন্তু নূন্যনতম কারণে কেউ কেউ আবার নিজের হাতেই সে জীবন নষ্ট করে। বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে এ প্রবণতা অনেকাংশে বেশি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারিবারিক ও সামাজিক সচেতনতার অভাব, বেকারত্ব, পারিবারিক সমস্যা, প্রেমঘটিত জটিলতা, আর্থিক চাপ, একাডেমিক ফল খারাপ করাসহ কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়ায় শিক্ষার্থীরা আত্মহননের মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অনেকে ভাবছে, আত্মহত্যার মধ্যেই মুক্তি রয়েছে। সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও চলতি বছরে চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার করেছেন বলে জানা গেছে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, চলমান সমাজ বাস্তবতায় অনেকেই মানিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছেন। আর্থিক অনটন আর প্রত্যাশার সাথে প্রাপ্তির সমন্বয়হীনতাও আত্মহত্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার কাউন্সেলিংয়ের অভাবও রয়েছে।
জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) অধিভুক্ত বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী মনিজা আক্তার মিতু গত ১৬ জুলাই আত্মহত্যা করেন। অনার্স পরীক্ষায় তিন বিষয়ে ফেল করায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেন তিনি। মিতু ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী ছিলেন। মৃত্যুর সময় মিতুর হাতে একটি চিরকুট পাওয়া যায়। চিরকুটে মিতু লিখেছিলেন আমার আত্মহত্যার জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি পরীক্ষায় মা-বাবাকে সন্তুষ্ট করতে পারিনি। তাই আত্মহত্যা পথ বেছে নিয়েছি। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছে। এ দিকে ক্লাসে শিক্ষককের করা অপমান সইতে না পেরে গত বুধবার রাতে রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র আরমান শাহরিয়ার। শাহরিয়ারের বন্ধুরা জানায়, বুধবার দিবাগত রাত ১২টার দিকে সে সার্জারিক্যাল ব্লেড দিয়ে হাতের রগ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। পরে ফজলুল হক মুসলিম হলের ২০৯ নম্বর কক্ষ থেকে তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরান শাহরিয়ারের বন্ধু গাজী মোহাম্মাদ জাকারিয়া বলেন, আরমান অসম্ভব প্রতিভাবান একজন শিক্ষার্থী। বিভাগের একজন শিক্ষকের সাথে ওর দূরত্ব তৈরি হয়। পরে ওই শিক্ষক তাকে ক্রমাগত অপমান করতে থাকেন। এমনকি জুনিয়রদের ক্লাসেও তিনি আরমানকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এ জন্য অসহ্য হয়ে সে আত্মহত্যা করতে চেয়েছিল।
আত্মহত্যা করতে চাওয়ার কারণ জানতে চাইলে আরমান শাহরিয়ার বলেন, আমি আসলে আত্মহত্যা করতে চাইনি। আমার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়ার জন্য খাতায় নোট করছিলাম। এ সময় কি হয়ে গেলো বুঝতে পারিনি। ব্লেডটি হয়তো হাতের কাছেই ছিলো। কখন যে হাত কেটে নিয়েছি বুঝতেই পারিনি। আমার অবচেতন মন থেকে এটা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের মার্চে আত্মহত্যা করে ঢাবির ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সবুজ চন্দ্র মিত্র। সবুুজের বন্ধুদের ধারণ পরীক্ষায় কম নাম্বার পাওয়ায় সে আত্মহত্যা করেছে। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি আত্মহত্যা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ছাত্র রবিউল আলম। রবিউল আর্থিক অনটনের কারণে পারিবারিক অশান্তিতে ছিলেন বলে জানা গেছে। নববিবাহিত এ ছাত্র স্ত্রী এবং শাশুড়ির অপমান সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছেন বলে তার সহপাঠীদের ধারণা। একই বছরের ১৪ জানুয়ারি আত্মহত্যা করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের তাইফুর রহমান প্রতীক। তিনি ২০১১-১২ সেশনের ছাত্র ছিলেন। তার আত্মহত্যার পেছনেও একাডেমিক ফল খারাপ হওয়ার বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
এ ছাড়া গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার খবর পাওয়া গেছে। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই ২০১৮ সালে আত্মহত্যা করেছেন আট শিক্ষার্থী। এ ছাড়া গত বছর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে চার শিক্ষার্থী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। অধিকাংশ আত্মহত্যার পেছনেই রয়েছে পারিবারিক কলহ, প্রেম, একাডেমিক শিক্ষা নিয়ে হতাশা, কাঙ্ক্ষিত চাকরি না পাওয়াসহ নানাবিধ কারণ। আত্মহত্যার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত যেন শিক্ষার্থীরা না নেয়, তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সভা-সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি পালন করলেও ঠেকানো যাচ্ছে না এই প্রবণতা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিক্ষার্থীরা আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তির পথ খুঁজতে চান বলেই এমন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০০৫ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই আত্মহত্যা করেছে ১৭ জন ছাত্রছাত্রী। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যক্তিগত হতাশা, ক্লাস-এ্যাটেনডেন্সের চাপ, পরীক্ষার ঝুট-ঝামেলা, সম্পর্ক বিচ্ছেদ বিষয়ক বিষয়, অর্থনৈতিক সমস্যা, দীর্ঘদিন বেকার হিসেবে জীবন যাপন করা প্রভৃতি থেকে এক প্রকার মানসিক চাপ তৈরি হয়। তার ওপর ভূক্তভোগীরা বিষয়গুলো শেয়ার করতে না পারার কারণে এক প্রকার হতাশা তৈরি হয়। ফলে মুক্তির পথ হিসেবে তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।
শিক্ষকরা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগগুলোতে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী হওয়ায় শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের সংস্পর্শে আসতে পারেন না। তাদের সমস্যাও শিক্ষকরা বুঝতে পারেন না। ফলে শিক্ষার্থীদের সমস্যা এক প্রকার অজানাই থেকে যায় শিক্ষকদের। পরবর্তীতে ঘটে দুর্ঘটনা। বিষয়টি নিয়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. হারুন উর রশিদ আসকারী এর আগে বলেছিলেন, শুধু আমাদের শিক্ষার্থী নয়, যেকোনো আত্মহত্যার ঘটনা খুবই বেদনাদায়ক। অত্যন্ত দুঃখের। এটা হাতাশা আর অন্তর্মুখী প্রবণতা থেকে হচ্ছে। এ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা অনেক বেশি আত্মকেন্দ্রিক। ফলে আড্ডাসহ বন্ধুদের সাথে মিশলেও নিজেদের মধ্যে একটা দূরত্ব রাখে। এতে সমস্যার বিষয়গুলো নিজের মধ্যেই রেখে দেয়। পরে জীবনের সব থেকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। তবে আমরা বিষয়টিকে খুব গুরুত্বের সাথে নিয়েছি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আরিফা রহমান বলেন, আত্মহত্যার প্রবণতা আসলে একদিনে তৈরি হয় না। যেকোনো আচরণের পেছনে দুটি কারণ রয়েছে। শারীরিক এবং পরিবশেগত কারণ। অনেক শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে শক্ত। আবার কেউ কেউ খুবই দুর্বল। ফলে সামান্যতম আঘাতও অনেকেই সহ্য করতে পারে না। এতে চাপ নেয়ার ক্ষমতা তাদের কম থাকে। আবার পরিবেশগত কারণেও অনেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। বিশেষ করে বাবা-মা বা পরিবারের সাথে যেসব সন্তানের দূরত্ব রয়েছে তাদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি। তিনি আরো বলেন, পরিবারের চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তও অনেক সময় সন্তানকে আত্মহননের দিকে ঠেলে দেয়। এছাড়া যেসব ছেলেমেয়ে চাওয়ার সাথে সাথেই সব কিছু পেয়ে যায়, কখনো কাঙ্ক্ষিত জিনিস না পেলে তারা সহ্য করতে পারে না। নিজেকে ব্যর্থতা মনে করে। তখন অভিমান থেকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নির্দেশনা ও পরামর্শদান দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক মেহজাবীন হক বলেন, পরিবার, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার কারণে আত্মহত্যার ঘটনাগুলো বেশি ঘটছে। এর পেছনে কাজ করছে প্রযুক্তির অগ্রসরতা ও প্রতিযোগিতার মনোভাব। ফলে তরুণ-তরুণীরা তাদের সমস্যার সমাধান হিসেবে আত্মহত্যাকে বেঁচে নিচ্ছে। এ ধরনের একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনাকে প্রভাবিত করছে বলেও তিনি মনে করেন।