আচরণবিধি লংঘন

244

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন ছিল গত বুুধবার। এ দিনে উৎসবের আমেজে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন প্রার্থী কিংবা তাদের তরফে প্রতিনিধি ও সমর্থকরা। ইসির তথ্য অনুযায়ী সারাদেশে ৩ হাজার ৫৬ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে। দুঃখজনক হলেও বলতে হচ্ছে, মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার সময় বিভিন্ন স্থানে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা ঘটেছে, যার সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। দেখা গেছে, বড় দুই দলের অনেক নেতা, মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা বিপুল সংখ্যায় নেতাকর্মী ও সমর্থক নিয়ে মিছিল সহকারে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে গিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। কোথাও কোথাও মনোনয়নপত্র জমাদানকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। দেখা গেছে, কয়েকজন মন্ত্রী ও অনেক সংসদ সদস্যই পুলিশ প্রহরা নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচনী আচরণবিধি অনুযায়ী, মিছিল নিয়ে মনোনয়নপত্র জমাদানের সুযোগ নেই। নির্বাচন কমিশনের তরফে বলা হয়েছিল, প্রার্থী সর্বোচ্চ ৭ জন সঙ্গী নিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিতে রিটার্নিং অফিসারের অফিসে যেতে পারবেন। এই নির্দেশনা ব্যাপকভাবে লংঘিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। নির্বাচন কমিশন সারাদেশে ৬৯১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করেছে, যাদের দায়িত্ব নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া। এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকাই লক্ষ করা যায়নি। অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা যখন সকলের কাছেই দৃশ্যমান হয়েছে, তখন নির্বাচন কমিশনের সচিব জানিয়েছেন, তারা নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের কোনো খবর পাননি। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘনের বহু ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কমিশন তা দেখেও না দেখার ভান করেছে। লংঘনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি। মনোনয়নপত্র জমাদানের শেষ দিনেও নির্বাচন কমিশনের একই ধরনের নির্লিপ্ততা ও নিষ্ক্রিয়তা প্রত্যক্ষ করা গেছে।
নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। কোনো ক্ষেত্রে লংঘন ঘটলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াও তার এখতিয়ারের মধ্যেই পড়ে। তফসিল ঘোষণার আগে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বড় বড় পোস্টার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড, দেয়াললিখনে সারাদেশ ছেয়ে গিয়েছিল। এসব প্রচার উপকরণের শতকরা ৯৫ ভাগই ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের। দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশন একাধিকবার সময় বেঁধে দিয়েও প্রচারউপকরণগুলো সরাতে পারেনি। যাদের পক্ষে প্রচার উপকরণগুলো লাগানো হয়েছিল, তারা সরাননি। এই নির্দেশনা অমান্য করার জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নির্বাচন কমিশন নেয়নি। নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর করার ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান নিতো তাহলে বিধি লংঘনের ঘটনা কখনোই এতটা বাড়তে পারতো না। এ প্রসঙ্গে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমদ যথার্থই বলেছেন যে, এ বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশন আমলে নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে না। প্রথম থেকেই যদি এসব বিষয়ে গুরুত্ব দেয়া না হয়, তাহলে পরে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। এ কথা কে না জানে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অতীতের যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচন। এই নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে ও সংসদ বহাল রেখে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রশাসন ও পুলিশ ক্ষমতাসীন দলের অনুকূলে সাজানো আছে। ইতোমধ্যেই এই নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। নির্বাচনটি শুধুমাত্র অংশগ্রহণমূলক হলেই হবে না, তা অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে। এ জন্য সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। এ দায়িত্ব অবশ্যই নির্বাচন কমিশনের। তবে সরকারের সহযোগিতাও অত্যাবশ্যক। সরকার কতটা সহযোগিতা করবে, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। সে ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনকে তার ক্ষমতা ও এখতিয়ার পুরোপুরিভাবে প্রয়োগ করে যতটা সম্ভব নির্বাচনের মাঠ সমতল করতে হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের সদিচ্ছার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি লংঘনের সমূহ আশঙ্কা রয়েছে আগামীতে। এ আশঙ্কা সরকারি দলের দিক থেকেই বেশি। তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি লংঘনের ক্ষেত্রে সরকারি দলই এগিয়ে। আগামীতে এটা সামাল দেয়া নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কতটা সম্ভব হবে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে প্রতিটি দলকে সহনশীল, সহাবস্থানজনক ও রাজনীতিসুলভ আচরণ করার তাকিদ দিয়েছেন। নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটদের সঙ্গে আলোচনায় নিরপেক্ষ থেকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করার দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তার এই তাকিদ ও নির্দেশনা কার্যকর হতে তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। এটা নির্বাচন কমিশনের ভাবমর্যাদার যেমন অনুকূল নয়, তেমনি মানসম্মত নির্বাচন উপহার দেয়ার ক্ষেত্রেও তা হুমকিস্বরূপ। এমতাবস্থায় নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধি সুরক্ষায় নির্বাচন কমিশনকে আরো সতর্ক ও সাবধান হতে হবে। নিশ্চয়ই, এ নির্বাচন নির্বাচন কমিশনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ কথা মনে রেখেই তাকে সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। কারো প্রতি কোনোরূপ পক্ষপাতিত্ব প্রদর্শন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নির্বাচনী আইন ও আচরণবিধির লংঘন রোধে সর্বোচ্চ কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে। এ ব্যাপারে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদেরও বিরাট দায়িত্ব রয়েছে। তারা যদি আইন ও বিধি মেনে চলে, যেকোনো রকম লংঘন থেকে নিজেদের বারিত রাখে, তাহলে নির্বাচনের পরিবেশ যতটা সম্ভব গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে।