আইন আরো কঠোর করতে হবে

244
পরিবহনব্যবস্থা নৈরাজ্যকবলিত। সড়ক-মহাসড়ক এ খাতের মাফিয়া গোষ্ঠীর দখলে। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। মন্ত্রী-এমপিদের অনেকে এর পৃষ্ঠপোষক। তারা যা ইচ্ছা তা-ই করে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে তারা ফিটনেসহীন গাড়ি রাস্তায় নামাচ্ছে, প্রশিক্ষণ ছাড়াই চালকদের জন্য ড্রাইভিং লাইসেন্সের ব্যবস্থা করছে। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশেই ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করেছে তারা। গণপরিবহনের বাসগুলোর চেহারা দেখলেই এর মালিক-চালকদের মানসিকতা আঁচ করা যায়। যেখানে-সেখানে, রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা হয়। লেগুনাগুলো একেকটি যমদূত, বেশির ভাগ চালকই অপ্রাপ্তবয়স্ক ও প্রশিক্ষণহীন। রাস্তায় বাস-লেগুনার প্রতিযোগিতায় বেঘোরে প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। সপ্তাহখানেক আগে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের কাছে দুই বাসের প্রতিযোগিতার জেরে প্রাণ হারায় দুই শিক্ষার্থী। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। এর মধ্যেই আরো কয়েকজন শিক্ষার্থী ও মোটরসাইকেল আরোহী বাস বা কাভার্ড ভ্যানের চাপায় নিহত হয়েছেন। এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে হয় না। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি।
গ্রামীণ সড়ক, রাজপথসব পথেই চলছে ফিটনেসহীন গাড়ি। কোনোটির ব্রেক কাজ করে না, কোনোটির ইঞ্জিন চলন্ত অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায়। কোনোটির লুকিং গ্লাস বা নির্দেশক (ইন্ডিকেটর) বাতি নেই। কোনোটির লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত গাড়ির (তিন বা তদূর্ধ্ব চাকার) সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ। এসবের মধ্যে পাঁচ লাখ গাড়ি আনফিট। এ ছাড়া ১৬ লাখ অবৈধ (ড্রাইভিং লাইসেন্সহীন) চালক রয়েছে সড়কে-মহাসড়কে। মোটরসাইকেলের ফিটনেস সনদ নিতে হয় না। ফিটনেসের বিষয়টি দেখে বিআরটিএ। সংস্থাটির রাজধানীর মিরপুর কার্যালয়ে ডিজিটাল গাড়ি পরিদর্শন কেন্দ্র আছে, যা আর কোনো কার্যালয়ে নেই। সংস্থার পরিদর্শকদের বেশির ভাগ খালি চোখে গাড়ি দেখে ফিটনেস সনদ দেন। পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরাই বলে, ঘুষ দিলেই সনদ মেলে। মালিকরাও তৎপর এ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে। অভিযোগ আছে, তাঁদের কারণে বিভিন্ন জায়গায় গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার ডিজিটাল কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না।
এসবের ফলে বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার প্রাণ ঝরে পড়ে। এটা সরকারি হিসাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে ২১ হাজার এবং বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বছরে ১২ হাজার লোক প্রাণ হারায়। এ অবস্থার অবসান জরুরি। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনের দুর্বলতা এবং আইনের বাস্তবায়ন যথাযথ না হওয়ায় পরিস্থিতির ক্রমেই অবনতি হচ্ছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আইনের খসড়া নিয়ে বসছে মন্ত্রিসভা। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, সরকার এ ব্যাপারে কঠোর হোক। সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য যারা দায়ী তাদের কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে আইনটি অনুমোদন করা হোক এবং দ্রুত পাস করে সড়কে কার্যকর করা হোক। চলাচলে স্বস্তি আনা এবং সড়ক-মহাসড়ক যাত্রীদের জন্য সুরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা দ্রুত করতে হবে।