অস্থির মুদ্রাবাজার, ব্যাংক থেকে হাওয়া যাচ্ছে ডলার

16

এক মাসে ডলারের মজুদ কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ
খোলা বাজারেও প্রতি ডলার কিনতে হচ্ছে ৮৭ টাকা পঞ্চাশ পয়সায়
ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের শঙ্কা সংশ্লিষ্টদের
সমীকরণ প্রতিবেদন:
ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে বৈদেশিক মুদ্রাবাজার। সম্প্রতি ক্যাসিনোসহ বিভিন্ন অবৈধ কার্যক্রমের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর মুদ্রা বাজারের অস্থিরতা আরও বেশি বেড়েছে। ব্যাংক থেকে হাওয়া হয়ে যাচ্ছে ডলার। গত এক মাসে ডলারের মজুদ কমেছে সাড়ে ২০ শতাংশ। পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনতে বাধ্য হচ্ছে ব্যাংকগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে প্রতি ডলার বিক্রি হচ্ছে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। কিন্তু বাস্তবে আরও ১ থেকে ২ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এর বাইরে হঠাৎ করে খোলাবাজারেও চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় প্রতি ডলার কিনতে সাধারণ গ্রাহকের ব্যয় করতে হচ্ছে সাড়ে ৮৭ টাকা থেকে ৮৭.৫০ টাকা পর্যন্ত। কার্ব মার্কেটে ডলারের এই মূল্যবৃদ্ধি হুন্ডির প্রবণতা বাড়াচ্ছে, যা প্রকারান্তরে রেমিটেন্স প্রবাহে প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, অবৈধ অর্থ অর্জনকারীরা টাকাকে ডলার করে বিদেশে পাচার করছেন। এতে দেশে ডলারের চাহিদা প্রতিদিন বাড়ছে। ফলে প্রবাসী আয় (রেমিটেন্স) ব্যাংককিং চ্যানেলে না এসে হুন্ডিতে আসার আশঙ্কা করছেন তারা। তাই ডলার কেনাবেচার ওপর নজরদারির কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের সব ব্যাংক রেমিটেন্স ও রফতানি আয়ের মাধ্যমে ডলারসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রা অর্জন করতে পারে। তবে চাইলে বিপুল পরিমাণ ডলার নিজেদের কাছে রাখতে পারে না ব্যাংকগুলো। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতা অনুসারে ডলার ধারণের সীমারেখা (ওপেন পজিশন লিমিট) নির্ধারণ করা আছে। এই সীমারেখা অনুসারে দেশের সব ব্যাংক সর্বমোট ২২৩ কোটি ২৪ লাখ ডলার নিজেদের কাছে রাখতে পারে। ব্যাংকগুলোর কেনাবেচা শেষে নিজেদের সীমারেখার বাইরে গেলে তা কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছে বিক্রি করতে হয়। প্রতিটি ব্যাংকের লিমিট হচ্ছে তার মূলধনের সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। কিন্তু বাজার স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ডলার লেনদেনের ওপর সীমা বেঁধে দেয়া হলেও সেটা প্রকৃত পক্ষে কার্যকর হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ব্যাংকগুলো আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজারে ডলারের যে মূল্যের তথ্য দিচ্ছে বাস্তবে তার চেয়ে বেশি মূল্যে কেনাবেচা হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকেরও তেমন করার কিছু নেই। কারণ চাহিদা ও জোগানের মধ্যে পার্থক্য বেড়ে যাওয়ায় বাজারে সঙ্কট কিছুটা বেড়ে যাচ্ছে। অনেক ব্যাংক বাধ্য হয়ে নীতিমালার ফাঁকফোকর দিয়ে বেশি দরে লেনদেন করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ডলার মজুদ ছিল ৮৯ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। গত মাসের শুরুতে যা ছিল ১১২ কোটি ৬৫ লাখ ডলার। এক মাসের ব্যবধানে ডলারের মজুদ কমেছে ২০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই থেকেই ডলারের মজুদ কমতে শুরু করে। আগস্ট শেষ ও সেপ্টেম্বরের শুরুতে কিছুটা বেড়েছিল। ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে দুয়েক দিন বাদে প্রায় প্রতিদিনই ব্যাংকগুলোর মজুদ কমেছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) প্রেসিডেন্ট ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যাংকের ডলারের চাপ আগে থেকেই রয়েছে। রেমিটেন্স কিছুটা বাড়ছে। কিন্তু রফতানি কমেছে। ফলে ডলারের মজুদ কমে গেছে। বড় প্রকল্পের জন্য আমদানির চাপও রয়েছে। সঙ্কটের কারণে ডলারের দামও বাড়ছে।
এদিকে পর্যাপ্ত ডলার না থাকায় ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের পক্ষে আমদানির দায় মেটাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কিনে দায় মেটানো হচ্ছে। দুই বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ডলার কেনা অব্যাহত রয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আমদানি দায় মেটাতে ব্যাংকগুলো ২৩১ কোটি ডলার কিনেছে। এজন্য তাদের খরচ হয় ১৯ হাজার কোটি টাকা। গত অর্থবছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ১৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা ব্যয় করে ১৩৪ কোটি ডলার কেনে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। নতুন অর্থবছরেও ডলার কেনা অব্যাহত রয়েছে। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডলার কিনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ধরণা দিচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলার বিক্রিতে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। অতি জরুরী না হলে কাউকে ডলার দেয়া হচ্ছে। গত ১ অক্টোবর পর্যন্ত ৫ কোটি ৯০ ডলার বিক্রি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে ব্যাংকগুলোর চাহিদা এর থেকে অন্তত ২০ গুণ বেশি।
এদিকে ডলার সঙ্কট থাকায় খোলাবাজারে দাম বাড়ছে হু হু করে। খোলাবাজারে প্রতি ডলার ৮৭ থেকে ৮৭.৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক মাস আগেও খোলাবাজারে প্রতি ডলারের বিনিময়মূল্য ছিল ৮৫ টাকা ৫০ পয়সা। মাসের ব্যবধানে তা বেড়েছে প্রায় দেড় টাকা। নন ফিজিক্যাল ডলার (এ্যাকাউন্টভিত্তিক) কেন্দ্রীয় ব্যাংক বুধবার বিক্রি করেছে ৮৪ টাকা ৭৫ পয়সায়। ১ অক্টোবর এ দাম ছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরে প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রেমিটেন্স এসেছে ৪৫১ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ দশমিক ৬০ শতাংশ বেশি। জুলাই-সেপ্টেম্বরে রফতানি আয় হয়েছে ৯৬৪ কোটি ডলার। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় (এলসি খোলা) সাড়ে ৭ শতাংশ কমে হয়েছে ৪৬৮ কোটি ডলার। বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার এ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আতাউর রহমান প্রধান বলেন, আমদানির বিল পরিশোধ বাড়ছে। অন্যদিকে রফতানি আয় সেই হারে বাড়ছে না। ফলে ব্যাংকগুলোর ডলার মজুদ কমছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ডলারের দাম ১৫ পয়সা বাড়িয়েছে। এর প্রভাব বাজারে পড়ছে। তবে মজুদ ডলারের চেয়ে খোলাবাজারে নগদ ডলারের দাম বাড়ছে বেশি হারে। প্রতিদিনই এ ডলারের দাম বাড়ছে।
হঠাৎ করে নগদ ডলারের চাহিদা বাড়ার কারণে দাম বেড়েছে বলে জানান মানি চেঞ্জার এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোস্তফা খান। তিনি বলেন, তবে চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ কম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের কারণে অনেকে নগদ ডলার কিনে থাকতে পারেন, আবার হুন্ডি বেড়ে যাওয়াও এর কারণ হতে পারে। আবার দেশের বাইরে থেকে যে নগদ ডলার আসে, তার সরবরাহ ব্যাপক কমে গেছে। এসব মিলিয়ে ডলারের দর বাড়তির দিকে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আপাতদৃষ্টিতে ডলার মার্কেটে ক্যাসিনোর প্রভাব পড়েছে বলে ধরা যায়। বিদেশে টাকা পাচার বেড়ে গেছে। ডলারের চাহিদা আগেও ছিল, কিন্তু সম্প্রতি অনেক বেড়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, আন্তঃব্যাংক লেনদেনে ডলারের স্প্রেড ১ থেকে দেড় টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। তাহলে হুন্ডি বাড়বে। প্রবাসীরা বেশি লাভে ব্যাংকিং চ্যানেলের বাইরে রেমিটেন্স পাঠাবে। এতে রেমিটেন্সের গতি কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, সাধারণত অবৈধ অর্থ দেশে থাকে না, সেটি বিদেশে চলে যায়। বর্তমানে যেহেতু অভিযান চলছে, তাই যারা অভিযানের তালিকায় নেই তারাও নগদ টাকা ডলার করে বিদেশে পাচারের চেষ্টা করবে। এতে টাকা পাচারের হার বাড়ার আশঙ্কা করা যায়।
সূত্র বলছে, ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িত জুয়াড়িরা দেশ ছাড়ছেন। সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন নগদ ডলার। এজন্য মতিঝিলের ব্যাংকপাড়াসহ রাজধানীর প্রায় সব এলাকার মানি এক্সচেঞ্জগুলোয় ডলারের টান পড়েছে। টান পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার মতিঝিলের ভাসমান খুচরা বাজারেও। এ ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা হন্যে হয়ে ডলার খুঁজছেন। ১০ দিন আগেও মানি এক্সচেঞ্জগুলোয় ডলার বিক্রি করতে গেলে সর্বোচ্চ ৮৫ টাকা পাওয়া যেত। বুধবার ওই ব্যবসায়ীরাই ৮৭ টাকায় ডলার কেনার জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের এক চাকরিজীবী গত ২৬ সেপ্টেম্বর মতিঝিল থেকে ১ হাজার ডলার ক্রয় করেন। ওইদিন প্রতি ডলার কিনতে তার খরচ হয় ৮৬ টাকা। বিদেশ ভ্রমণের জন্যই ওই ডলার কিনেছিলেন তিনি। এক সপ্তাহ পর বিদেশ থেকে ফিরে ৩ অক্টোবর প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ৭০ পয়সা দরে উদ্বৃত্ত ৩০০ ডলার বিক্রি করে দেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্য সময় খোলাবাজার থেকে ডলার কিনে আবার বিক্রি করতে গেলে এক থেকে দেড় টাকা পর্যন্ত কম পাওয়া যেত। এবারই প্রথম ডলার কিনে এক সপ্তাহ পর ৭০ পয়সা লাভে বিক্রি করতে পেরেছি।’ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার কয়েকটি মানি এক্সচেঞ্জের সঙ্গে কথা বলেও এর সত্যতা পাওয়া যায়। বসুন্ধরা সিটির মিয়া মানি এক্সচেঞ্জ এ প্রতিবেদকের কাছে প্রতি ডলার ৮৬ টাকা ৫০ পয়সায় ক্রয় ও ৮৭ টাকা ৩০ পয়সায় বিক্রি করার কথা জানান।
শুধু মার্কিন ডলারই নয়, গত এক সপ্তাহে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার খোলাবাজারে দর বেড়েছে প্রায় সবকটি মুদ্রার। ব্রিটিশ পাউন্ড, ইউরো, কানাডিয়ান ডলার, অস্ট্রেলিয়ান ডলারের মূল্য বেড়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সিঙ্গাপুরী ডলার ও মালয়েশিয়ান রিঙ্গিতের। এমনকি বেশির ভাগ মানি এক্সচেঞ্জের কাছেই সিঙ্গাপুরী ডলার পাওয়া যায়নি। খোলাবাজারে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্যাসিনোবিরোধী অভিযান চলার পর থেকেই খোলাবাজারে বৈদেশিক মুদ্রার টান পড়েছে। অনেকেই মার্কিন ডলার বা অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রা কেনার জন্য ঘুরছেন। এটিকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্রও গড়ে উঠেছে। ক্যাসিনোর সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগ সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়া পাড়ি জমাতে চাইছেন। এজন্য ডলারের পাশাপাশি খোলাবাজারে এ দুটি দেশের মুদ্রারও টান পড়েছে। চাহিদার কারণে বেশি দরে কেনার প্রস্তাব করেও বাজারে পর্যাপ্ত ডলার পাওয়া যাচ্ছে না।