অনিয়ম করে নিজ স্ত্রীকে গোপনে নিয়োগ!

70

জেএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ
আলমডাঙ্গা অফিস:
আলমডাঙ্গার জগন্নাথপুর-শ্রীরামপুরে জিকে ক্যানেলপাড়ে অবস্থিত জেএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে নিজের স্ত্রীকে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে প্রধান শিক্ষক তাঁর স্ত্রী উলফাত আরা খাতুনকে ব্যাকডেটে ওই পদে নিয়োগ দেখিয়ে বর্তমান সভাপতির নিকট স্বাক্ষর করতে গেলে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে। এদিকে, এ ঘটনায় প্রধান শিক্ষকের বিচার দাবি করে বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকসহ স্থানীয়রা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এবং জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের বিচার দাবি করে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।
জানা গেছে, আলমডাঙ্গার জগন্নাথপুর-শ্রীরামপুরের ক্যানেলপাড়ে অবস্থিত জেএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠার সময় সাইদুজ্জামান নামের এক ব্যক্তিকে সৃষ্ট পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখার অনুমোদন লাভের পর ওই শাখায় সাইদুজ্জামানকে বহাল করা হয়। সেই থেকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে সাইদুজ্জামান ৬ষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখার শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে বিদ্যালয়টির ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক ইমারত আলীর আকস্মিক মৃত্যুতে সাইদুজ্জামানকে উক্ত পদে সমন্বয় করে নেওয়া হয়। তবে আজ অবধি তিনি ৬ষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখা হতে অব্যাহতি নেননি।
এদিকে, দীর্ঘদিন পর করোনার কারণে বিদ্যালয় বন্ধের সুযোগে প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম ব্যাকডেটে ৫ বছর পেছনের তারিখে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে ২০১৪ সালে তাঁর স্ত্রী উলফাত আরাকে নিয়োগ দেখিয়েছেন। যা তদন্ত করলেই অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ।
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির অন্য সদস্য, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা জানান, ১৯৯৪ সালে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ২০১২ সালে যশোর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড বিদ্যালয়টিতে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখা চালুর অনুমোদন দেয়। কিন্তু তার সাত বছর আগে সেখানে ‘গ’ শাখা খোলা হয় এবং সাইদুজ্জামান নামের একজনকে ওই শাখায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ইমারত আলী মারা গেলে তাঁর শূন্যপদে সাইদুজ্জামানকে সমন্বয় করে নেওয়া হয়। সে হিসেবে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখার শিক্ষকের পদটি শূন্য হয়ে পড়ে। তবে আজ অবধি সাইদুজ্জামান ৬ষ্ঠ শ্রেণির ‘গ’ শাখা শিক্ষকের পদ থেকে অব্যাহতি দেননি। অথচ, প্রধান শিক্ষক ব্যাকডেটে ২০১৪ সালে নিজ স্ত্রীকে নিয়োগ দেখান। ফলে একই পদে গত ৬ বছর ধরে দুজন শিক্ষক কী-ভাবে চাকরি করছেন? এদিকে, এ ঘটনা জানাজানি হলে এলাকার মানুষ, বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের এমন অনিয়মের বিচার দাবি করে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সাংসদ, জেলা প্রশাসক, দুর্নীতি দমন কমিশন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
এ বিষয়ে সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলী এবং উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবৈধ নিয়োগ বন্ধ করতে বলেন।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আমিরুল ইসলাম জানান, ‘প্রধান শিক্ষক সম্পূর্ণ অবৈধভাবে তাঁর স্ত্রীকে নিয়োগ দেখিয়ে কাগজ তৈরি করেছেন। যা আমরা শিক্ষক হয়েও জানতে পারিনি। যখন তাঁর স্ত্রী উলফাত আরাকে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে দিতে বলেন, তখন আমরা বুঝতে পারি। এ বিষয়ে আমরা তাৎক্ষণিক চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার ছেলুন, জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, দুর্নীতি দমন কমিশন ও শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছি।’ খুব শিগগিরই আমরা প্রেস কনফারেন্স করব।’
জেএস মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানায়, ২০১৬ সালে তারা ওই বিদ্যালয়ের ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছে। গত প্রায় ৫ বছরে একদিনও উলফাত আরা খাতুনকে বিদ্যালয়ে দেখেনি তারা। ক্লাস নেওয়া তো দূরের কথা কোনো ক্লাস রুটিনেও তাঁর নাম দেখতে পায়নি।
একটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এত বড় অনিয়ম কিছুতেই মানা যায় না উল্লেখ করে জগন্নাথপুর গ্রামের রবিউল ইসলাম ও একই গ্রামের ইকরামুল হোসেন এই অনিয়মের উপযুক্ত বিচার দাবি করেন।
এ বিষয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলামের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, ‘এই নিয়োগ বৈধ। আমার স্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়ায় কিছু শিক্ষক বিরোধিতা করছেন। আমার কাগজপত্র সঠিক আছে।’
উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার ইমরুল হক জানান, ‘প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম তাঁর বিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষকের উচ্চতর স্কেলের জন্য রেজ্যুলেশন স্বাক্ষর করতে এলে ইউএনও মহোদয় আমাকে দেখে দিতে বলেন। আমি তাঁদের তিনজন শিক্ষকের উচ্চতর স্কেলের বিষয় পড়ে ইউএনও স্যারকে বললাম স্যার, ঠিক আছে। স্যার পড়তে গেলে তাঁর চোখে ধরা পড়ে উলফাত আরার বেতনের জন্য সুপারিশ করার বিষয়টি। পরে উনি আমাকে ডাকেন, আমিও পড়ে দেখলাম। পরে ইউএনও শিক্ষিকা উলফাত আরার বেতনের বিষয়টি কেটে দেন এবং পরে তাঁর নিয়োগও স্থগিত করেছেন বলে জেনেছি।’
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল বারি জানান, ‘এই নিয়োগ নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্তাধীন। তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন বিদ্যালয়ের বর্তমান সভাপতি।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. লিটন আলীর সঙ্গে কথা হলে তিনি এই অবৈধ নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে জানান। ইউএনও আরও বলেন, ‘বিষয়টি আমার গোচরে আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছি এবং এ ব্যাপারে তদন্ত চলমান রয়েছে।’