অজানার পথে দুঃসাহসিক অভিযাত্রা

31

বিশ্ব ডেস্ক:
১৯৬৯ সালের ১৬ জুলাই। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যের কেনেডি স্পেস সেন্টার। অজানার পথে যাত্রা শুরু করলেন তিন দুঃসাহসী অভিযাত্রী নিল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্স। লক্ষ্য চন্দ্রজয়। তাঁদের বাহন মহাকাশযান অ্যাপোলো–১১। যাত্রা শুরুর পর প্রথম চার দিন পরিকল্পনা অনুযায়ীই চলছিল সবকিছু। কিন্তু চাঁদের বুকে পা রাখার মিনিট বিশেক আগে হঠাৎই পৃথিবীতে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় নভোচারীদের। এরপর একের পর এক আসতে থাকল আরও বিপত্তি। মানুষের চন্দ্রজয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে এ বছর। ২০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশেই নানা আয়োজনে উদ্যাপন করা হবে মুহূর্তটিকে। ঐতিহাসিক এই অধ্যায়ের শুরু ১৯৬১ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি একদিন তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট লিন্ডন জনসনকে ডাকলেন। বললেন, ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে মহাকাশ জয়ের প্রতিযোগিতায় আমরা হেরে যাচ্ছি। পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করা প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক। মহাকাশে যাওয়া প্রথম জীবিত প্রাণী লাইকা। চন্দ্রাভিযানে যাওয়া প্রথম রকেটে ছিল লাল পতাকা। চাঁদের দূরপ্রান্তের ছবি যে ক্যামেরায় তোলা হয়েছে, তা-ও সোভিয়েত। আগে সমুদ্র নিয়ন্ত্রণকারীরা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করত। আগামী দশকে মহাকাশ হয়ে উঠবে গুরুত্বপূর্ণ। যার নিয়ন্ত্রণে মহাকাশ, পৃথিবী তার নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় আমরা পিছিয়ে থাকতে পারি না।’ অ্যাপোলো-১১-এর নভোচারীদের নিয়ে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটার্ন-৫ রকেটের উৎক্ষেপণ। এএফপিঅ্যাপোলো-১১-এর নভোচারীদের নিয়ে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে স্যাটার্ন-৫ রকেটের উৎক্ষেপণ। এএফপিকেনেডির এ কথায় লিন্ডন জনসন উপযুক্ত মানুষের খোঁজ শুরু করলেন। একপর্যায়ে পেয়েও গেলেন। তিনি প্রকৌশলী ভের্নার ফন ব্রাউন। তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার মহাকাশ কর্মসূচির ‘গডফাদার’ বলে অভিহিত করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি বাহিনীর জন্য তিনি রকেট বানিয়ে দিয়েছিলেন। বিশ্বযুদ্ধ শেষে তিনি মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। পরে যোগ দেন নাসায়। তিনি প্রেসিডেন্ট কেনেডিকে বলেছিলেন, মহাকাশ জয়ের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্র তখনই বিজয়ী হতে পারবে, যখন তারা চাঁদে মানুষ পাঠাতে পারবে। মূলত এরপরই শুরু হয় চন্দ্রজয়ের প্রস্তুতি। চন্দ্রজয়ের ৫০ বছর ২০ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশেই নানা আয়োজনে উদ্যাপন করা হবে মুহূর্তটিকে ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই দুই মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং ও এডউইন অলড্রিন পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদের বুকে পা রাখেন। এ অভিযানের কমান্ডার ছিলেন আর্মস্ট্রং। অভিযানের ছবি তোলার দায়িত্বেও ছিলেন তিনি। বাজ অলড্রিন নামে পরিচিত এডউইন অলড্রিন ছিলেন মহাকাশযানের পাইলট। চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছে এই দুজন অ্যাপোলো–১১ মহাকাশযানের লুনার মডিউল ইগলে চেপে রওনা হন। মূল মহাকাশযান থেকে যান আরেক নভোচারী মাইকেল কলিন্স। চাঁদে অবতরণের ২০ মিনিট আগে হঠাৎ করেই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের হিউস্টনে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ইগলের। তিন মহাকাশচারীর চন্দ্রজয়ের সাক্ষী হতে পৃথিবীবাসীর মনোযোগ তখন টেলিভিশন ও রেডিওতে আটকে। এমন মুহূর্তে যোগাযোগবিচ্ছিন্নতা অভিযানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে যেন ভয়ের স্রোত বইয়ে দিল। নিয়ন্ত্রণকক্ষ বুঝতে পারে, ইগলের কম্পিউটার–ব্যবস্থায় অতিরিক্ত চাপ পড়েছে। কম্পিউটারটি ঠিক সময়ে সাড়া দিচ্ছে না। চাঁদের কক্ষপথে অ্যাপোলো-১১-এর লুনার মডিউল ইগল। দূর আকাশে পৃথিবী। ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই। ছবি: এএফপিচাঁদের কক্ষপথে অ্যাপোলো-১১-এর লুনার মডিউল ইগল। দূর আকাশে পৃথিবী। ১৯৬৯ সালের ২১ জুলাই। ছবি: এএফপিএদিকে নিয়ন্ত্রণকক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারায় ইগলের গতিও কমাতে পারছিলেন না আর্মস্ট্রং। তিনি বুঝতে পারেন, চাঁদের বুকে যে জায়গায় তাঁদের অবতরণের কথা, সেখান থেকে কয়েক মাইল দূরে ছিটকে পড়তে চলেছেন। বাধ্য হয়েই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা বন্ধ করে ইগলের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নেন আর্মস্ট্রং। এরপর অবতরণের নতুন জায়গা খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু চাঁদের পাথুরে পৃষ্ঠে তেমন কোনো জায়গাও পাচ্ছিলেন না। এদিকে ইগলের জ্বালানিও ফুরিয়ে আসছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে যান স্বল্পভাষী আর্মস্ট্রং। অলড্রিন হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘কন্ট্যাক্ট লাইট’। অর্থাৎ চাঁদের বুকে অবতরণ করেছে ইগল। এরপরই আর্মস্ট্রং বার্তা পাঠান হিউস্টনে। নিয়ন্ত্রণকক্ষে তখন খুশির জোয়ার। ফিরতি বার্তায় নিয়ন্ত্রণকক্ষের চার্লি ডিউক বলেন, ‘আমাদের দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ধন্যবাদ তোমাদের, আমরা আবারও শ্বাস নিতে পারছি।’